আজ মহান বিজয় দিবস: ৫৪ বছরে স্বাধীনতা, নতুন পথে জনযাত্রা

আজ ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। এটি বাঙালি জাতির সাহসিকতা এবং বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় দিন। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের এই দিনে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। আজ জাতি ৫৪তম বিজয় দিবস পালন করছে— এক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে।
ঐতিহাসিক পটভূমি:
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে গণহত্যা শুরু করলে মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেই রাতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রেফতার করে।
স্বাধীনতার ঘোষণা: গ্রেফতারের পূর্বে, তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। জনগণের কাছে স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছানো এবং আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে, মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যা জনগণকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে।
দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলা এই জনযুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন এবং লাখো মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারান। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজী ৯১,৬৩৪ জন সৈন্যসহ যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নবজাগরণ ৩৬ জুলাই’ :
১৯৭১ সালের মহান বিজয়ের পর বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আরও একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত রচিত হয় ২০২৪ সালের আগস্টে। জুলাইয়ের আন্দোলনকে অনেকে ‘৩৬ জুলাই’ নামে অভিহিত করেন, যা ৫ আগস্ট এক ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও তীব্র প্রতিরোধের মুখে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন সরকারের পতন হয়। এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে, ১৯৭১ সালের মতো আজও দেশের জনগণ সম্মিলিতভাবে যেকোনো স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রস্তুত। ৫ আগস্টের এই জনবিজয়কে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই ঘটনাপ্রবাহ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— স্বাধীনতা শুধু অর্জন নয়, তাকে রক্ষা করা এবং গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাও একই বীরত্বের কাজ।
জাতীয় কর্মসূচি ও শ্রদ্ধার্ঘ্য
বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দিনটি উপলক্ষে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়েছে।
সূচনা: দিবসটির সূচনা হয়েছে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে।
জাতীয় স্মৃতিসৌধ (সাভার): সূর্যোদয়ের পরপরই প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর পরপরই বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্য, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিবর্গসহ সর্বস্তরের জনগণ শ্রদ্ধা জানান।
চট্টগ্রামের কর্মসূচি: চট্টগ্রামেও যথাযথ মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে কাট্টলিস্থ মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভে (ডিসি পার্কের দক্ষিণ পার্শ্বে) ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের সূচনা হবে।
স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে।
সকাল ৮টায় চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কুচকাওয়াজ ও ডিসপ্লে প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।
বেলা সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সম্মানে সংবর্ধনা প্রদান করা হবে।
নগরীর বিভিন্ন সিনেমা হলে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা টিকেটে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হবে।
সম্মিলিত সামরিক কুচকাওয়াজ: সকালে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হবে সম্মিলিত সামরিক কুচকাওয়াজ।
অন্যান্য আয়োজন: দেশের বিভিন্ন ভবন ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা, বিজয় মেলা, আলোচনা সভা এবং সব উপাসনালয়ে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা করা হবে।
আজকের বার্তা:
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে বাংলাদেশ আজ একটি নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এগিয়ে চলেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে।
দ্রষ্টব্য: মোবাইল ফোন চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে বহু প্রতীক্ষিত ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা আজ (১৬ ডিসেম্বর) চালু হচ্ছে না। এনইআইআর চালুর নতুন ডেডলাইন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ জানুয়ারি।
বিজয় দিবসের এই শুভক্ষণে, জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে সেই সব অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। তাদের আত্মত্যাগ এবং ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা— এই দুই-ই আগামী দিনের সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে আমাদের প্রেরণা যোগাবে।





