ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫ দিনে ৩৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন, আস্থা সংকটে বাড়ছে চাপ
বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০১:২৫ অপরাহ্ন

ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫ দিনে ৩৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন, আস্থা সংকটে বাড়ছে চাপ

ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫ দিনে ৩৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন, আস্থা সংকটে বাড়ছে চাপ
ছবি সংগৃহীত।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকটিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত পাঁচ কার্যদিবসে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন, গ্রাহকদের বিক্ষোভ এবং শেয়ারহোল্ডারদের আপত্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—আমানত প্রত্যাহারের চাপ কতটা বাড়লে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত আসতে পারে? যদিও ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা উত্তোলনের সঙ্গে চেয়ারম্যান অপসারণের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে গ্রাহকদের আস্থাহীনতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং আমানত বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ বাড়বে।


পাঁচ দিনে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন


ব্যাংকটির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, খুরশীদ আলমের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের পর থেকে আমানত উত্তোলনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রথম চার কার্যদিবসে প্রায় ২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। পরে বিভিন্ন শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একদিনেই প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত তুলে নেওয়া হয়েছে।

ফলে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে মোট উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট আমানত নেমে এসেছে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়।


ব্যাংকারদের মতে, মোট আমানতের তুলনায় এ পরিমাণ উত্তোলন এখনও ব্যাংকের জন্য তাৎক্ষণিক তারল্য সংকট তৈরি করার মতো নয়। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতার বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

কেন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে খুরশীদ আলম

গত ২৪ মে চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করার পর একই দিনে খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তার নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহক, কর্মকর্তা এবং একাংশ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

'ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম'-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে পরিচালনা পর্ষদের একটি অংশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, খুরশীদ আলমের দীর্ঘ ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

কত টাকা উত্তোলন হলে সংকট প্রকট হবে

ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কয়েক হাজার কোটি টাকা উত্তোলন তাৎক্ষণিকভাবে অস্তিত্বগত সংকট তৈরি করে না। কারণ ব্যাংকটির শক্তিশালী আমানতভিত্তি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার সুযোগ এবং বিভিন্ন তারল্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিতে পারে যদি উত্তোলনের ধারা কয়েক সপ্তাহ ধরে অব্যাহত থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমানত প্রত্যাহারের পরিমাণ যদি ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়ে যায় এবং একই সঙ্গে নতুন আমানত প্রবাহ কমে যায়, তাহলে তা ব্যাংকের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তখন গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে বিশেষ পদক্ষেপ, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন কিংবা নীতিগত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কী বলছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গ্রাহকরা নগদ অর্থ উত্তোলন করছেন নাকি অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করছেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে এমন অবস্থায় নেই যে গ্রাহকদের উত্তোলনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সহায়তা দেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করিয়ে দেন, ২০২৪ সালের আগস্টেও ব্যাংকটি একই ধরনের চাপের মুখে পড়েছিল। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছিল।

আন্দোলন আরও বিস্তৃত হচ্ছে

চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ ইতোমধ্যে কলমবিরতি কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গ্রাহক সংগঠনগুলোও ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে এবং ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোতে আরও সংস্কার আনতে হবে।

এতে করে পরিস্থিতি কেবল ব্যাংকিং সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রশাসনিক, করপোরেট এবং রাজনৈতিক মাত্রাও পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আস্থাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন চেয়ারম্যান থাকবেন কি থাকবেন না—সেটি নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমানতকারীদের আস্থা কত দ্রুত পুনরুদ্ধার করা যায়।

কারণ ব্যাংকিং ব্যবসার ভিত্তি মূলত বিশ্বাস। গ্রাহকরা যখন মনে করেন তাদের অর্থ নিরাপদ, তখন ব্যাংক শক্তিশালী থাকে। কিন্তু সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যাংকও চাপে পড়ে যেতে পারে।

সামনে কী হতে পারে

বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যদি আমানত প্রত্যাহারের প্রবণতা আরও বাড়ে এবং ব্যাংকের কার্যক্রমে এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয়, তাহলে চেয়ারম্যানের বিষয়ে পুনর্বিবেচনার চাপ বাড়তে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত নেই যে নির্দিষ্ট পরিমাণ আমানত উত্তোলনের সঙ্গে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত যুক্ত রয়েছে। বাস্তবে সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে গ্রাহকদের আস্থা সংকট কতটা গভীর হয়, আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয় এবং তা ব্যাংকের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর কতটা প্রভাব ফেলে তার ওপর।

এ মুহূর্তে ইসলামী ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তারল্য নয়, বরং আস্থা পুনরুদ্ধার। আর সেই আস্থা ফিরিয়ে আনাই নির্ধারণ করতে পারে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পথচলা।




৪২ শীর্ষ ঋণখেলাপির পাচারের অর্থ উদ্ধারে মাঠে নামছে ৮ আন্তর্জাতিক সংস্থা

৪২ শীর্ষ ঋণখেলাপির পাচারের অর্থ উদ্ধারে মাঠে নামছে ৮ আন্তর্জাতিক সংস্থা
ছবি সংগৃহীত।

ব্যাংক খাত থেকে লুটে নেওয়া ও বিদেশে পাচার করা হাজার হাজার কোটি টাকা ফেরত আনতে এবার বড় ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শীর্ষ ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর পর দেশের আরও ৪২টি বড় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও দেশে ফিরিয়ে আনতে মাঠে নামছে বিশ্বখ্যাত আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও তদন্তকারী সংস্থা।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১২টি দেশে গোপনে গড়ে তোলা সম্পদের অবস্থান চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ উদ্ধারে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চুক্তি ও কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে ওই সব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া ৩৮টি ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে উপস্থিত দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা উপস্থিত ছিলেন। বিদেশে সম্পদ উদ্ধারে যেসব ব্যাংক এখনো ওই আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেনি, তাদের দ্রুত তা সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) ডাটাবেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খেলাপির তালিকায় থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিদেশে অর্থ পাচারের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে এসবি এক্সিম গ্রুপ, হাবিব গ্রুপ, ইয়াসীর গ্রুপ, এডব্লিউআর গ্রুপ, লিবার্টি গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, লস্কর গ্রুপ ও সাদ মুসা গ্রুপের মতো বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী রয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তাদের পাচার করা সম্পদ মূলত যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে।

অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের এ তৎপরতায় যুক্ত হওয়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো হলো– গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রোল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।

সম্পদ পুনরুদ্ধারের এই কার্যক্রমে কোনো ব্যাংককে আগাম কোনো অর্থ দিতে হবে না। পুরো বিষয়টি পরিচালিত হবে ‘নো উইন, নো পে’ নীতিতে। অর্থাৎ বিদেশি পরামর্শক সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে সম্পদ অনুসন্ধান করবে ও আইনি লড়াই চালাবে। পরবর্তী সময়ে উদ্ধার হওয়া সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ তারা পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে।
সম্পদ উদ্ধারের পুরো আইনি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, প্রথম ধাপে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সংস্থাগুলো বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান ও আর্থিক পরিমাণ চিহ্নিত করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী প্রথমে সেই সম্পত্তি ফ্রিজ বা জব্দ করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে আদালতের নির্দেশে এসব সম্পত্তি বিক্রি বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ বাংলাদেশে ফেরত এনে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ সমন্বয় করা হবে।

বৈঠক শেষে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বাইরে চলে গেছে এবং তা ফেরত আনতে ব্যাংকগুলো একযোগে কাজ শুরু করেছে। অর্থ উদ্ধার ছাড়াও পাচারের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে যেন এমন লুটপাট না ঘটে, সে বিষয়টিতেও জোর দেওয়া হচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দফায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং শীর্ষ ১০টি বিতর্কিত শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে যৌথ তদন্ত শুরু হয়। এনবিআরের সিআইসি, সিআইডি ও দুদকের যৌথ প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে দেশে-বিদেশে তাদের প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এবার দ্বিতীয় দফায় এই ৪২ খেলাপির বিরুদ্ধে একই কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
 




ট্যুর অপারেটরদের বড় সুবিধা: বিদেশে ঘুরতে ডলারের ঝামেলা শেষ, টাকায় মিলবে ভ্রমণ প্যাকেজ

ট্যুর অপারেটরদের বড় সুবিধা: বিদেশে ঘুরতে ডলারের ঝামেলা শেষ, টাকায় মিলবে ভ্রমণ প্যাকেজ
ছবি সংগৃহীত।

বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ কিনতে এখন আর সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে ভাবতে হবে না বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের। ভ্রমণ প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এখন থেকে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) নিবন্ধিত সদস্য ট্যুর অপারেটররা ভ্রমণকারীদের কাছ থেকে টাকায় অর্থ গ্রহণ করে বিদেশে প্যাকেজ বিক্রি করতে পারবেন। সংগৃহীত অর্থের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সরাসরি বিদেশে সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারীদের কাছে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

রোববার (৯ আগস্ট) এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব টোয়াব সদস্য ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে বিদেশি ট্যুর অপারেটর, হোটেল বা ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির বৈধ চুক্তি কিংবা ব্যবসায়িক সমঝোতা রয়েছে, তারা এ সুবিধার আওতায় আসবেন। তাদের আবেদনক্রমে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো বিদেশে আবাসন, পরিবহনসহ প্রকৃত ভ্রমণসেবার বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে পারবে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, নিয়মিত বার্ষিক ভ্রমণ কোটার বাইরে একজন ভ্রমণকারীর জন্য প্রতি ক্যালেন্ডার বছরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যাবে। এ ক্ষেত্রে ভ্রমণকারীর পাসপোর্ট নম্বরের বিপরীতে লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে ট্যুর অপারেটরকে।

এ ছাড়া ভ্রমণকারীর কাছ থেকে লিখিত ঘোষণা নিতে হবে যে, অন্য কোনো ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে তিনি নির্ধারিত বার্ষিক সীমা অতিক্রম করেননি। তবে ৩ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের প্যাকেজের ক্ষেত্রেও সুযোগ রাখা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্যাকেজের মূল্য আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় সংগ্রহ করতে হবে। এ ধরনের লেনদেনে এডি ব্যাংকগুলো অ্যাকোয়ারিং সেবা দিতে পারবে।

বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট ইনভয়েস, চুক্তি, বিস্তারিত ভ্রমণসূচি, ভ্রমণকারীদের তালিকা এবং টাকায় অর্থ গ্রহণের প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করতে হবে এডি ব্যাংকগুলোকে। বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর সাত দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত বিবরণীও জমা দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নীতিগত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা। তারা মনে করছেন, টাকায় বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ কেনার সুযোগ চালু হওয়ায় গ্রাহকদের জন্য লেনদেন আরও সহজ হবে এবং এতে স্বচ্ছতা আসবে। এটি দেশের আউটবাউন্ড ট্যুরিজম খাতের বিকাশ ঘটাতে এবং ট্যুর অপারেটিং ব্যবসাকে আরও গতিশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।




বাংলা কিউআর ব্যবহারে চাঁদাবাজি ও জাল নোটের ঝুঁকি কমবে : গভর্নর

বাংলা কিউআর ব্যবহারে চাঁদাবাজি ও জাল নোটের ঝুঁকি কমবে : গভর্নর
ছবি সংগৃহীত।

বাংলা কিউআর ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে চাঁদাবাজি ও জাল নোটের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি নগদ টাকা পরিবহনের ঝুঁকিও কমবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

শনিবার (৮ আগস্ট) চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলে বাংলা কিউআর লেনদেন বিষয়ক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থার (আইএফসি) মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় পরিচালিত ‘ক্যাশলেস ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে ২০ জন নারী মার্চেন্টসহ প্রায় ১২০ জন বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী মার্চেন্ট অংশ নেন।

গভর্নর বলেন, বর্তমানে দেশে মাসে এক কোটি লেনদেন হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যে দৈনিক এক কোটি লেনদেনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তিনি বলেন, বর্তমানে ছয় কোটি মানুষ বাটন ফোন ব্যবহার করেন। তাদের হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ও ইন্টারনেট সুবিধা না থাকাকে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গ্রাহকদের স্বল্পমূল্যে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল সরবরাহের বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে।

মোস্তাকুর রহমান বলেন, ডিজিটাল পেমেন্ট নিশ্চিত হলে ব্যবসায়ীরা কর্মচারীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। এতে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে, জাল নোটের ঝুঁকি কমবে এবং নগদ টাকা পরিবহনের ঝুঁকি হ্রাস পাবে।

তিনি আরও বলেন, টাকা ছাপাতে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন বাড়ানো গেলে এই ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিমূলক পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রয়োজন। বাংলা কিউআর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ২৪ লাখ মার্চেন্ট বাংলা কিউআর ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ লেনদেন হচ্ছে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। কর ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত বাড়াতেও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থার (আইএফসি) প্রতিনিধি হাসান শাহরিয়ার বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল মাসে ২০ লাখ লেনদেন। বর্তমানে মাসে এক কোটি লেনদেন হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি সাড়া পাচ্ছি। বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের অগ্রযাত্রায় আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের নির্বাহী পরিচালক মো. হানিফ মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কর্মশালায় বাংলা কিউআরের ব্যবহার পদ্ধতি, সুবিধা, প্রয়োজনীয়তা ও সচেতনতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগ-১-এর অতিরিক্ত পরিচালক মো. পারওয়েজ আনজাম মুনির, যুগ্মপরিচালক জুয়েল মজুমদার ও মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন তিনটি অধিবেশন পরিচালনা করেন।

পরে বাংলা কিউআর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, আন্তঃসীমান্ত লেনদেন ব্যবস্থা চালু, লেনদেনের খরচ কমানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে মার্চেন্টদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন গভর্নর।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের পরিচালক (প্রশাসন) স্বরূপ কুমার চৌধুরী, পরিচালক (পরিদর্শন) মো. নুরুল আলম, পরিচালক (ব্যাংকিং) ইয়াসমিন রহমান বুলা, পরিচালক (বৈদেশিক মুদ্রা) মাহবুবুল রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলা কিউআর বাস্তবায়ন ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।