চট্টগ্রাম উপকূলীয় বনবিভাগের ডিএফও দুদকের নজরে

# পদায়নে কোটি টাকার ঘুষ, বনভূমি বিপন্ন
# সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, স্থানীয় বনভূমি দখল”
# ডিএফওর মাসিক মাসেহারা নেওয়ার অভিযোগ
বন অধিদপ্তরের দেড় হাজার কোটি টাকার ‘সুফল’ প্রকল্পে দুর্নীতির খোঁজ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রকল্পে নয়ছয়, ভুয়া কাগজে অর্থ উত্তোলন, বদলি বাণিজ্যসহ নানা অসংগতির নথিপত্র জব্দ করেছে সংস্থাটি। দুদক বলছে, নথিপত্র বিশ্লেষণ করে পরবর্তী সময়ে কমিশন তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে।
জানা যায়, দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ২৫ শতাংশ বনভূমি প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে সরকারি বনজ সম্পদ উন্নয়নে ২০১৮ সালে ‘টেকসই বন ও জীবিকা’ শীর্ষক ‘সুফল’ প্রকল্প গ্রহণ করে বন অধিদপ্তর। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বন মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় প্রকল্পের মাঠপর্যায়ে পদে পদে ঘটে অনিয়ম। সুফল প্রকল্প, বনায়ন প্রকল্প কিংবা রাজস্ব খাতের বরাদ্দের টাকা কাগজকলমে কাজ দেখিয়ে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। একইভাবে সিন্ডিকেটে পদায়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে শত শত কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বরাদ্ধের হিংসভাগ আত্মসাতের অভিযো উঠেছে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, বিশেষ করে উপকূলীয় বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে বেলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধে। সরকারি টাকা লোপাট করে তিনি নাকি আমেরিকা পালানোর চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে তিনি আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন এবং চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার আবেদন করেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের এই কর্মকর্তা উপকূলীয় বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচির ৬১ শতাংশ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এ খাতে ৫০ কোটি টাকার অধিক বরাদ্দ থাকলেও এর বড় অংশই আত্মসাতে হারিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি ও বেসরকারি একাধিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপকূলীয় বন সুরক্ষা ও বৃক্ষরোপণ প্রকল্পগুলোর প্রায় ৬১ শতাংশ অর্থ আত্মসাৎ বা অপব্যয়ে হারিয়ে গেছে। কাগজপত্রে বন রক্ষার কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশ স্থানে গাছ নেই, অনেক জায়গায় রোপিত চারা নষ্ট হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম দুনীতি দমন কমিশনের এক কর্মকর্তা না প্রকাশ না করার শর্তে জানান উপকূল বনবিভাগের দুনীতির বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। যে কোন সময় অভিযান চালানো হবে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বাঁশখালী, সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা ও মিরসরাই অঞ্চলে বনভূমি দখল, অবৈধ কাঠচুরি ও মাছচাষের নামে বন ধ্বংস অব্যাহত রয়েছে। বহু জায়গায় রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল ও কিছু অসাধু বনকর্মীর যোগসাজশে এসব দখল ও ধ্বংসের কার্যক্রম চলছে বছরের পর বছর।
বন বিভাগের অভ্যন্তরেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পুরোনো। এক বনকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“উর্ধ্বতন মহলের অনুমতি ছাড়া মাঠপর্যায়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। অনেক সময় লিখিত অভিযোগ গেলেও তা নথির স্তূপে চাপা পড়ে থাকে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিউল আজম বলেন,
“বন সংরক্ষণের নামে অনেক প্রকল্প নেওয়া হলেও, টেকসই মনিটরিং বা জবাবদিহি না থাকায় এসব প্রকল্পের প্রভাব মাঠে দেখা যায় না। বন রক্ষায় স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি।”
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে বন অধিদপ্তরের কয়েকটি প্রকল্পে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে এবং কিছু কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, বাস্তব চিত্র ভয়াবহ। এখনো বহু বনভূমি দখল হচ্ছে, কাঠ পাচারকারীরা রাতের অন্ধকারে সক্রিয়। তাদের দাবি, সঠিক তদারকি না থাকলে উপকূলীয় বনভূমি একদিন পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে।
পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরা বলেন, “বন ধ্বংস রোধে প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, শক্ত আইন প্রয়োগ ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ। অন্যথায় উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঢাল একদিন সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে।”
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।











