দুদকের অভিযোগপত্রে ‘গরিব’ স্বামীর কোটিপতি স্ত্রীরা

পুলিশের একজন সাবেক কনস্টেবল এবং সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের একজন সাবেক অফিস সহকারীর (পিয়ন) স্বামীদের অর্থবিত্ত না থাকলেও তাদের স্ত্রীরা কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক। স্বামীদের চাকরিজীবনে অর্জিত জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ অর্থকে বৈধ করতে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রামের দুই গৃহিণী— জাহানারা বেগম ও হাসিনা বেগম-এর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।
দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে, কাগজে-কলমে এই দুই গৃহিণী কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেও বর্তমান বাজারমূল্যে তাদের জায়গা-জমির মূল্য কয়েক গুণ বেশি।
কনস্টেবল সেলিম হাওলাদারের স্ত্রী জাহানারা:
চট্টগ্রাম নগরের জাকির হোসেন বাই লেনের বাসিন্দা জাহানারা বেগম সোয়া কোটি টাকার সম্পদের মালিক। তাঁর স্বামী সাবেক কনস্টেবল সেলিম হাওলাদার ২০১২ সালে অবসর নেন। দুদক তদন্তে জাহানারার এক কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার টাকার সম্পদের হদিস পেয়েছে। এর মধ্যে এক কোটি ১২ লাখ টাকার সম্পদের বৈধ উৎসের খোঁজ মেলেনি।
জাহানারা বেগম নগরের জিইসি মোড়সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ছয়তলা ভবন, টিনশেড কলোনি ও দোকানের মালিক। ৬ দশমিক ৩৫ কাঠা জমি তিনি মাত্র আট হাজার টাকায় কিনেছিলেন।
স্বামীর অবৈধ অর্থ বৈধ করতে জাহানারা বিভিন্ন প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন।
তিনি ২০২০ সালে মিমি সুপারমার্কেটে 'কর জুয়েলার্স'-এ ২০ লাখ টাকার স্বর্ণ বিক্রি করে আয় দেখান, কিন্তু মিমি সুপারমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদিন নিশ্চিত করেন যে ২০২০ সালে ওই নামে কোনো দোকানের অস্তিত্ব ছিল না।
বোনকে কেনা সম্পত্তিকে বৈধ করতে 'হেবামূলে' (দান সম্পত্তি) পেয়েছেন বলে দেখিয়েছেন।
অভিযুক্ত সেলিম হাওলাদার ও জাহানারা বেগম দুজনেই তাঁদের নামে কোনো অবৈধ সম্পদ বা জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পিয়ন আলমগীর লাতুর স্ত্রী হাসিনা:
নগরের পাথরঘাটার বাসিন্দা আরেক গৃহিণী হাসিনা বেগম। তাঁর স্বামী মো. আলমগীর লাতু ছিলেন পাহাড়তলী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাবেক অফিস সহকারী (পিয়ন)। ছোট চাকরি করেও তিনি আয়কর নথি না দিলেও গৃহিণী হাসিনা বেগম আয়কর নথি জমা দিয়েছেন। তিনি এখন চার ইউনিটের ছয়তলা ভবনের মালিক।
হাসিনা বেগম আয়কর নথিতে এক কোটি ১২ লাখ টাকার সম্পদ (স্থাবর, অস্থাবর, পারিবারিক ব্যয়সহ) থাকার তথ্য দেন। দুদক তদন্ত করে তাঁর বৈধ আয় পেয়েছে সাড়ে ৪৬ লাখ টাকার। তাঁর নামে থাকা ৬৪ লাখ টাকার সম্পদের বৈধ আয়ের উৎস সংস্থাটি পায়নি।
হাসিনা দাবি করেছেন, তাঁর বাবা ও প্রবাসী ভাইয়ের দান করা অর্থে তিনি এই সম্পত্তি কিনেছেন। পাথরঘাটার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এই তিন কড়া জমির দাম কেনার সময়ও প্রায় দেড় কোটি টাকার কম ছিল না। মৌজা দর দেখিয়ে কালো টাকা সাদা করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আলমগীর লাতু দাবি করেন, স্ত্রীর নামে থাকা সম্পত্তি তাঁর শ্বশুর ও প্রবাসী ভাইয়ের অর্থে কেনা। হাসিনা বেগম এ বিষয়ে স্বামীর ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, "আমার স্বামীই আমার আয়কর নথি ও যাবতীয় কাজ দেখাশোনা করে থাকে, আমি কিছু জানি না।"
দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এর উপসহকারী পরিচালক সবুজ হোসেন জানান, স্বামীদের চাকরিজীবনের অবৈধ সম্পদ থেকেই স্ত্রীরা কোটিপতি হয়েছেন। দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত করে লাখ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য তুলে ধরে সম্প্রতি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।












