নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার ‘হানিট্র্যাপ’-এ পুলিশ-রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী
বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৩ অপরাহ্ন

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার ‘হানিট্র্যাপ’-এ পুলিশ-রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার ‘হানিট্র্যাপ’-এ পুলিশ-রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী
ছবি সংগৃহীত।

চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতা ও তার চক্রের ‘হানিট্র্যাপ’-এর শিকার হয়েছেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী। তাদের হানিট্র্যাপে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি সরকারের একটি দায়িত্বশীল সংস্থার অনুসন্ধান সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের ছৈয়দাবাদ এলাকার বাসিন্দা জোবাইরুল হক জিয়ান (৩১) উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক শিক্ষা ও পাঠচক্রবিষয়ক সম্পাদক। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরী নারীদের পরিচয় ও ছবি ব্যবহার করে ফাঁদ পাতেন। পরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রলুব্ধ করে ব্যক্তিগত মুহূর্তের গোপন ভিডিও ধারণ করে সেগুলো ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করেন।

প্রায় এক দশক ধরে তিনি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের টার্গেট করে এই প্রতারণা চালিয়ে আসছেন।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, জিয়ানের প্রতারণার প্রাথমিক ধাপ হলো সুন্দরী নারীর ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা। এরপর টার্গেট করা ব্যক্তির কাছে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে বার্তা আদান-প্রদান। সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে কথোপকথন হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে সরিয়ে নেন। সেখানে বিভিন্ন অ্যাপের সাহায্যে নারীকণ্ঠে কথা বলে এবং অডিও-ভিডিও কলের মাধ্যমে কৌশলে ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ করেন। পরিচয় গোপন রাখতে নিজেকে কখনো চট্টগ্রামের পরিচিত তরুণী বা মডেল, কখনো এক সন্তানের মা ও স্বামী পরিত্যক্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন।

‘হানিট্র্যাপ’-এ সাবেক সিএমপি কমিশনার

তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন পাহাড়তলী থানার ওসি (বর্তমানে ডিবিতে) বাবুল আজাদের মাধ্যমে চট্টগ্রামের মডেল সানজিদা ইসলাম সায়মার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় জিয়ানের। বাবুল আজাদ সানজিদাকে নিজের ‘শ্যালিকা’ পরিচয়ে তৎকালীন চট্রগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জিয়ান সানজিদা ইসলাম সায়মার নামে একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে কমিশনারকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান। পরে মেসেঞ্জার থেকে শুরু করে অডিও ও ভিডিও কলে তাদের যোগাযোগ চলতে থাকে। সায়মার আড়ালে মূলত কাজ করছিলেন জিয়ান নিজেই।

তদন্তে হাসিব আজিজের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল নম্বর ও চারটি ভিডিও পাওয়া গেছে। এর একটিতে দেখা যায়, সানজিদা ইসলাম সায়মার ফেসবুক লাইভ থেকে ১৫ সেকেন্ডের অংশ কেটে এনে ভিডিও কলে চালানো হয়েছিল। এতে বোঝা যায় অপর প্রান্তে প্রকৃত সানজিদা ছিলেন না। ২০২৫ সালের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই ভার্চুয়াল যোগাযোগের চারটি ভিডিওর একটিতে সাবেক কমিশনারকে আপত্তিকর অবস্থায় এবং বাকি তিনটিতে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়।

হাসিব আজিজ চারটি ভিডিওর মধ্যে তিনটি নিজের বলে স্বীকার করলেও একটি ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছেন। ‘হানিট্র্যাপে’ পড়ার বিষয়টি স্বীকার করে  তিনি জানান, পরিচয়টি ভুয়া জানার পরই তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং অ্যাকাউন্টটি ব্লক করে দেন। তবে ওই চক্র তাকে দিয়ে কোনো অনৈতিক কাজ করাতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, হাসিব আজিজের ব্যক্তিগত ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে সিএমপির বিভিন্ন থানার পদায়ন ও বদলিতে প্রভাব ফেলতেন ছাত্রলীগের জিয়ান ও দুই ওসি—বাবুল আজাদ ও জাহেদুল ইসলাম। পদায়ন ও বদলির দেনদরবার চূড়ান্ত হওয়ার পর জিয়ানকে দিয়ে সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজের কাছে ফোন করানো হতো এবং কাঙ্ক্ষিত অফিস আদেশ আদায় করা হতো। মূলত কোন থানায় কাকে ওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে কিংবা কাকে সরিয়ে দেওয়া হবে, এসব প্রশাসনিক বিষয়ে পুরো প্রভাব বিস্তার করত এই চক্র। সিএমপির তৎকালীন কর্মকর্তারা বিষয়টি জেনেও গোপন ভিডিও প্রকাশের আশঙ্কায় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।

সূত্র জানিয়েছে, হাসিব আজিজ চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে এপিবিএনে যোগ দিলে সরকারের একটি দায়িত্বশীল সংস্থা অনুসন্ধান শুরু করে। সেই অনুসন্ধানে জিয়ানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ, গোপন ভিডিও ও অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য পাওয়া যায়।

তদন্তে জানা যায়, জাহেদুল ইসলামকে কর্ণফুলী থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করার বিষয়টি আগেই একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় জানানো হয়েছিল। পদায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর জিয়ান ও জাহেদুলের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ওসি জাহেদুল জিয়ানকে একটি আইফোন উপহার দেন এবং নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে নিয়ে যান। জিয়ানের ফেসবুক প্রোফাইলে ওসির গাড়িতে চড়ে কর্ণফুলী টানেল পার হওয়ার ছবি পাওয়া গেছে।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে পাঁচলাইশ থানার বর্তমান ওসি জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘এরকম তো অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। কে, কখন, কোথায় তা ব্যবহার করেছে বা আমার সঙ্গে ছিল কি না, আমি আসলে জানি না।’

আর পাহাড়তলী থানার সাবেক ওসি ও বর্তমান সিএমপির ডিবি কর্মকর্তা বাবুল আজাদ বলেন, ‘আমার বিষয়ে অভিযোগের প্রমাণ নিয়ে ভালো করে নিউজ করেন। তার (জিয়ান) সাথে আমার সখ্যতা থাকার বিষয়টা আপনারা প্রমাণ করেন। আর এটা নিয়ে যে মেয়েটা ভুক্তভোগী তার সাথে কথা বলেন। তাহলেই সত্য-মিথ্যা সব প্রমাণ হয়ে যাবে।

এদিকে, বর্তমান সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান।  তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। সাবেক পুলিশ কমিশনারও এ ধরনের কোনো অভিযোগ লিখিত বা মৌখিকভাবে জানাননি। আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে দিন, আমি ব্যবস্থা নেব।’

ফাঁদে ফেলতে ৫৪ অ্যাকাউন্টের নেটওয়ার্ক, জিয়ানের পক্ষে ফোন প্রতিমন্ত্রীর!

ছাত্রলীগ নেতা জিয়ানের প্রতারণার পরিধি কেবল একটি বা দুটি ভুয়া অ্যাকাউন্টে সীমাবদ্ধ ছিল না; তদন্তে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৫৪টি নারী পরিচয়ের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। জিয়ান ‘জান্নাতুল মনি’ নামের একটি পরিচয়কে নিজের বোন হিসেবে এবং ‘জান্নাতুল নাইমা’ নামে আরেকটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, এই ভুয়া নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জিয়ান এমনকি বর্তমান একজন প্রতিমন্ত্রী, একজন সংসদ সদস্য, ডজনখানেক রাজনৈতিক নেতা এবং পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে অনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করেছেন।

চট্টগ্রাম পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা  জানান, সম্প্রতি জিয়ানকে গ্রেপ্তার করতে সোর্স নিয়োগ করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। তার বসতবাড়িতে নজরদারিও বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি জানতে পেরে জেলা পুলিশকে থামাতে বর্তমান একজন প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে ফোন করান জিয়ান।

সরকারি যে সংস্থা বিষয়টি তদন্ত করছে তারা সাবেক সিএমপি কমিশনারের হানিট্র্যাপে পড়ার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিলেও অন্যদের বিষয়ে কী কী জানা গেছে তা বলতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে অন্য রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের নাম-পরিচয় জানতে পারেনি ।

এদিকে, বর্তমান সরকারের কোন প্রতিমন্ত্রী ছাত্রলীগ নেতা জিয়ানের জন্য সম্প্রতি সুপারিশ করেছেন তা নিয়েও মুখ খুলছে না চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ। তাই বিষয়টি এখনো গোপন রয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসনে এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে নানা আলোচনা চলছে বলে সূত্রে জানা গেছে।

আগে ট্র্যাপে ফেলতেন আওয়ামী নেতাদের

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জোবাইরুল হক জিয়ানের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস নতুন নয়। ২০২০ সালের ২৯ মে সাতকানিয়া থানা-পুলিশের এক বিশেষ অভিযানে তিনি প্রথম গ্রেপ্তার হন। তখন শিল্পপ্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ের ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ভুয়া প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। সেখানে ব্যক্তিগত কথোপকথনের স্ক্রিনশট দেখিয়ে অর্থ দাবির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে নারীকণ্ঠে কথা বলে ঘনিষ্ঠতা তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাতকানিয়ায় পরিচালিত ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানের সময় আবারও গ্রেপ্তার হন জিয়ান। সে সময়ও ভুয়া নারী পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করা এবং মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার নাম করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিশ্চিত করেছিল পুলিশ।

বারবার গ্রেপ্তারের পরও তার অপরাধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার যোগাযোগের জাল রাজনৈতিক অঙ্গন পেরিয়ে পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

সাতকানিয়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর রাসেল উদ্দিন  বলেন, প্রতারক জিয়ানের নানা অপকর্মের তথ্য পুলিশের কাছে প্রেরণ করা ও প্রতিবাদ করায় আমাকে ওসি বাবুল আজাদের নির্দেশে এসআই মনিরুলসহ একটি দল নগরের রাইফেল ক্লাব এলাকা থেকে আটক করে। পরে আমাকে দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। আমি আড়াই মাস জেলে ছিলাম।

জিডি করেছেন আসল মডেল সায়মা

এদিকে নিজের নাম ও ছবি ব্যবহারের বিষয়টি জানতে পেরে পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন প্রকৃত মডেল সানজিদা সায়মা।

তিনি  বলেন, আমার নাম ব্যবহার করে ফেক অ্যাকাউন্ট খুলে পুলিশের কর্মকর্তার সঙ্গে নানা অপকর্ম করেছে বলে জানতে পারি। এ ঘটনায় আমি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি। যদিও পুলিশ এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে আমাকে আর কোনো আপডেট দেয়নি। এভাবে আমার মানহানির জন্য দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

কী বলছেন অভিযুক্ত জিয়ান

অভিযুক্ত জোবাইরুল হক জিয়ান সব অভিযোগ অস্বীকার করে  বলেন, ‘এটি আমাদের পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিষয়। বিষয়টি নিয়ে একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। যে দুই ওসির কথা বলা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। সিএমপি কমিশনারের মতো মানুষের কাছে আমি কিছুই না। তিনি চাইলেই তো আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতেন, তিনি নিলেন না কেন?’




গুজব ছড়ানোর আগেই ঠেকাতে চায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ

গুজব ছড়ানোর আগেই ঠেকাতে চায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ
ছবি সংগৃহীত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে আগেই তা শনাক্ত করে প্রতিরোধ করতে চায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। এজন্য সাইবার মনিটরিং টিমকে আরও সক্রিয় করার পাশাপাশি গুজব শনাক্ত, তথ্য যাচাই ও দ্রুত সঠিক তথ্য প্রচারের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুরোনো ছবি-ভিডিও বা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা ঠেকাতে সার্বক্ষণিক নজরদারির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের উদ্যোগে ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে সাইবার টিম কর্তৃক করণীয়’ শীর্ষক অনলাইন সভায় এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের সভাপতিত্বে জুম অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন সার্কেলের কর্মকর্তা, অফিসার ইনচার্জ, ডিআইও-১, ওসি ডিবি ও সাইবার মনিটরিং টিমের সদস্যরা অংশ নেন।

সভায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য ঘটনা হিসেবে নেওয়ার আগে সেটি সত্য কি না যাচাই এবং গুজবের উৎস শনাক্ত করার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। কোনো ছবি, ভিডিও বা পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর সেটি সত্য ধরে না নিয়ে এর উৎস, সময় ও প্রেক্ষাপট যাচাই করতে বলা হয়েছে। পুরোনো বা অন্য কোনো ঘটনার ছবি-ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দুর্গাপূজা, পূজামণ্ডপ, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টে। ধর্মীয় উসকানি বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে—এমন কোনো কনটেন্ট নজরে এলে সেটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে যাচাই করতে বলা হয়েছে।

সভায় পুলিশ সুপার গুজব শনাক্তকরণ, তথ্য যাচাই, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিতকরণ, প্রয়োজন হলে দ্রুত সঠিক তথ্য প্রচার—এই ধারাবাহিকতায় কাজ করার নির্দেশনা দেন। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্টের লিংক, স্ক্রিনশট, সংশ্লিষ্ট আইডি বা পেজ, সময়সহ অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

জেলা পুলিশ জানায়, শুধু গুজব শনাক্ত করে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; গুজবের বিপরীতে দ্রুত সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি। এ কারণে কোনো ঘটনা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে সংশ্লিষ্ট থানা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে দ্রুত প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত করে সংক্ষিপ্ত, নিরপেক্ষ ও সময়োপযোগী তথ্য প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এজন্য থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপরাধের উপাদান পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

সভায় জনগণের প্রতিও যাচাই ছাড়া কোনো পোস্ট বা তথ্য শেয়ার না করার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেয়ে আগেই শনাক্ত করে তা প্রতিরোধ করা এবং দ্রুত সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সাইবার মনিটরিং কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য।




জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় আইসিডির চার্জে ৯.৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি

জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় আইসিডির চার্জে ৯.৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি
ছবি সংগৃহীত।

ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানোর পর বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) থেকে দেওয়া ডিজেল নির্ভর বিভিন্ন সেবার চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইসিডিএ)।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিআইসিডিএর জেনারেল সেক্রেটারি স্বাক্ষরিত এক সার্কুলারে এ তথ্য জানানো হয়। বর্ধিত চার্জ একই দিন থেকে কার্যকর হয়েছে।

সার্কুলারে বলা হয়, সরকার ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। এতে ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে বেসরকারি আইসিডিগুলোর পরিচালনায় জ্বালানি-নির্ভর বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে সর্বশেষ পর্যালোচিত হারের ওপর ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ জ্বালানি সারচার্জ বাড়ানো হয়েছে।

বর্ধিত চার্জের আওতায় রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর ও আইসিডির মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন বা হলেজ, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ও আইসিডির মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন, খালি কনটেইনার ওঠানো-নামানোর (লিফট-অন/লিফট-অফ) চার্জ এবং রপ্তানি পণ্য স্টাফিং ও হ্যান্ডলিং প্যাকেজ।

এ ছাড়া রপ্তানি বোঝাই কনটেইনারের ভেরিফায়েড গ্রস মাস (ভিজিএম) বা ওজন নির্ধারণের চার্জও ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে লোড ইয়ার্ডে কনটেইনার ওঠানো, ওজন মাপার স্থানে নেওয়া, ওজন নির্ধারণ এবং পুনরায় লোড ইয়ার্ডে পরিবহন ও নামানোর মতো সেবা রয়েছে।

আমদানি পণ্য ডেলিভারি প্যাকেজ চার্জও এই বৃদ্ধির আওতায় এসেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর বা পিসিটি থেকে আইসিডিতে আমদানি বোঝাই কনটেইনার পরিবহন, আইসিডিতে কনটেইনার নামানো, ডেলিভারি ইয়ার্ডে স্থাপন এবং শ্রমিকসহ কনটেইনার থেকে ট্রাকে আমদানি পণ্য সরবরাহের সেবা অন্তর্ভুক্ত।

সার্কুলারে সংশ্লিষ্ট আইসিডিগুলোকে নিজ নিজ গ্রাহকদের সর্বশেষ পর্যালোচিত হারের ওপর ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধির বিষয়টি অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার  বলেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আইসিডিগুলোর অপারেশনাল ব্যয় সরাসরি বেড়েছে। এ কারণে ডিজেলনির্ভর সেবাগুলোর বিপরীতে বর্ধিত চার্জ কার্যকর করা হয়েছে।




নতুন কুঁড়িতে নিবন্ধনে দেশসেরা চট্টগ্রাম

নতুন কুঁড়িতে নিবন্ধনে দেশসেরা চট্টগ্রাম
ছবি সংগৃহীত।

দেশব্যাপী নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় নিবন্ধনে বড় ব্যবধানে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম। এ জেলায় নিবন্ধন করেছে ১ লাখ ৮১ হাজার ১৪০ জন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ঢাকায় নিবন্ধন করেছে ৫৯ হাজার ৫৮০ জন। অর্থাৎ ঢাকার চেয়ে চট্টগ্রামে ১ লাখ ২১ হাজার ৫৬০ জন বেশি নিবন্ধন করেছে।

প্রতিযোগিতাটি নিয়ে বড় প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমরা ইতিহাস গড়ব।

চট্টগ্রামে বিপুলসংখ্যক নিবন্ধনের পেছনে খেলাধুলার প্রতি স্থানীয়দের আগ্রহের পাশাপাশি জেলা প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রচার-প্রচারণা এবং উদ্যোগের প্রভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তাদের প্রচার-প্রচারণা এবং প্রচেষ্টার কারণেও নিবন্ধনে প্রভাব পড়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উদ্যোগের ভূমিকা ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবার মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা ছিল—কে কত বেশি নিবন্ধন করাতে পারে।

চট্টগ্রামে খেলাধুলার প্রতি মানুষের আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন ক্রীড়া সচিব। তার ভাষ্য, চট্টগ্রামে খেলাধুলার অনেক আয়োজন রয়েছে। জাতীয় পর্যায়েও এ জেলা থেকে অনেক ভালো খেলোয়াড় উঠে আসেন।

জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা আবদুল বারী বলেন, শুরু থেকেই জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে পরিকল্পিত প্রচারণার পাশাপাশি উপজেলা, ইউনিয়ন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ধারাবাহিক সমন্বয় করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একাধিক সভা করার পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে সভা করা হয়।

ইউনিয়ন পর্যায়েও নিবন্ধন কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়। নির্ধারিত রূপরেখা অনুযায়ী ইউনিয়ন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা এসব কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেন। জেলা ক্রীড়া অফিসের কর্মকর্তারাও এ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।

আবদুল বারী বলেন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সময়ে সময়ে দেওয়া নির্দেশনা নিবন্ধন বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। নিবন্ধন বাড়ানোর কার্যক্রম প্রতিদিন চালানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মাঠপর্যায়ের প্রচারণার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চালানো হয়। স্থানীয় সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের পাশাপাশি ফেসবুকে প্রতিযোগিতার তথ্য প্রচার করা হয়। স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকেরাও এতে যুক্ত হন। ইউনিয়ন থেকে উপজেলা পর্যন্ত তৃণমূল পর্যায়ে তথ্য অফিসও প্রচারণায় সহযোগিতা করে।

এ কার্যক্রমে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিনের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা।

জেলাভিত্তিক নিবন্ধনে চট্টগ্রামের পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা। তৃতীয় স্থানে কুমিল্লা—সেখানে নিবন্ধন করেছে ৫১ হাজার ৮৪৮ জন। চতুর্থ স্থানে বরিশালে ৫১ হাজার ৫৮০ এবং পঞ্চম স্থানে পটুয়াখালীতে ৪৯ হাজার ৫৬৫ জন নিবন্ধন করেছে।

শীর্ষ ২০ জেলার তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে দিনাজপুরে ৪১ হাজার ৬৯৯, সপ্তম স্থানে সিলেটে ৪০ হাজার ৫৩৬, অষ্টম স্থানে ময়মনসিংহে ৪০ হাজার ৫৪, নবম স্থানে কক্সবাজারে ৩৬ হাজার ৫৪৬ এবং দশম স্থানে বগুড়ায় ৩৪ হাজার ৯৬৮ জন নিবন্ধন করেছে।

গত আসরে আটটি ইভেন্ট থাকলেও এবার আরও দুটি যুক্ত করে মোট ১০টি ইভেন্ট রাখা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে দল গঠনের পর উপজেলা পর্যায়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।

নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বালক ও বালিকা উভয় বিভাগে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, দাবা, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস, মার্শাল আর্ট ও টেবিল টেনিসে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।