পদ্মা–মেঘনায় দেড় লাখ লিটার ডিজেল গায়েব


যমুনা অয়েল কোম্পানির পর এবার পদ্মা ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানির ডিপোতেও বড় ধরনের ডিজেল ঘাটতির ঘটনা ধরা পড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, দুটি কোম্পানির নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপোতে মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ লিটার ডিজেল কম পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গার মূল টার্মিনাল থেকে পাইপলাইনে সরবরাহ পাঠানোর পর ডিপোতে পৌঁছে পরিমাপে এই ঘাটতি দেখা যায়। বিষয়টি সামনে আসার পর তেল পরিবহণ, মিটারিং ও ট্যাংকের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, ১০ নভেম্বর মেঘনা পেট্রোলিয়ামের গোদনাইল ডিপোতে পাইপলাইনে পাঠানো হয় ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৭২৪ লিটার ডিজেল। তবে ডিপোতে ট্যাংকে মেপে পাওয়া যায় ২৪ লাখ ২২ হাজার ৪৭৩ লিটার—এতে ঘাটতি দাঁড়ায় ১ লাখ ১৫ হাজার ২৫১ লিটার। একইভাবে ১১ নভেম্বর পদ্মা অয়েল পিএলসির ডিপোতে পাঠানো হয় ২৫ লাখ ২০ হাজার ৭৭০ লিটার, কিন্তু পাওয়া যায় ২৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৬৮ লিটার—এখানে ঘাটতি ২৭ হাজার ৩০২ লিটার। সব মিলিয়ে দুই ডিপোতে ঘাটতি প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ লিটার।
ডিপো সূত্রগুলো বলছে, তেল মাপার প্রচলিত পদ্ধতি এখনো ‘ডিপ স্টিক’ দিয়ে ট্যাংকের গভীরতা মাপার ওপর নির্ভরশীল। দুই মিলিমিটার কম দেখালেই প্রায় ১ হাজার ১৮০ লিটার তেলের পার্থক্য দেখানো সম্ভব। এ কারণে প্রযুক্তিনির্ভর মিটারের পাশাপাশি এই সনাতনী পদ্ধতিতে অনিয়মের সুযোগ থাকছে। পাইপলাইনের চট্টগ্রাম ও ঢাকার প্রান্তে মিটার থাকলেও ডিপো ট্যাংকের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ আছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহীরুল হাসান বলেন, “পাইপলাইনে সরবরাহ এখনো পরীক্ষামূলক। দুই প্রান্তের মিটার বা ট্যাংকের সক্ষমতায় ত্রুটি থাকতে পারে। শীতের সময় তাপমাত্রা কমে তেলের ঘনত্ব কমে যাওয়ায় পরিমাপে পার্থক্য দেখা দিতে পারে। সবকিছু যাচাই করা হচ্ছে।”
পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, “পাইপলাইনের মিটার হিসাব অনুযায়ী বাড়তি ১ হাজার ৮০০ লিটার তেল আছে। শীতে মাপ কম আসতে পারে। নিয়মিত সরবরাহ শুরু হলে এসব ঠিক হয়ে যাবে।”
এদিকে যমুনা অয়েল কোম্পানিতে এর আগেও তেল চুরি, ট্যাংকের সক্ষমতা বাড়তি দেখানো ও অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠেছিল। গত সেপ্টেম্বরে যমুনার ফতুল্লা ডিপোতে বিশাল ঘাটতির ঘটনা সামনে আসার পর তদন্তে দেখা যায়, ট্যাংকের সক্ষমতা ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেখানো হয়েছিল। নতুন করে সক্ষমতা যাচাইয়ে দুটি ট্যাংকের ধারণক্ষমতা বেড়ে যায় ৭৭ হাজার ৪৯২ লিটার। এতে ধারণা মিলেছে—ট্যাংকের চার্ট ম্যানিপুলেশন করে দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরি করা হয়েছে।
বিপিসি সূত্র জানায়, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তিন কোম্পানির ডিপোতে ট্যাংকের সক্ষমতা, দুই প্রান্তের মিটার, পাইপলাইনের অবস্থা এবং সার্ভে রিপোর্ট—সবকিছু নতুন করে যাচাই করা হবে। প্রকল্প পরিচালক মো. আমিনুল হক বলেন, “পাইপলাইনে তেল গায়েবের সুযোগ নেই। কোথাও না কোথাও তেল আছে। মিটার রক্ষণাবেক্ষণ চলছে। মিটার ঠিক হলে তিন ডিপোর সক্ষমতাও যাচাই করা হবে।”
জাহাজ থেকে পেট্রলপাম্প পর্যন্ত তেল চুরির ইতিহাস বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত সমস্যা। চুরি, অপচয় ও অনিয়ম রোধে সরকার ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন প্রকল্প হাতে নেয়। তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি বছরের মার্চে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। ব্যয়ও বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায়। পাইপলাইনের উদ্দেশ্য ছিল তেল পরিবহণে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে পরীক্ষামূলক চালু হওয়া সরবরাহেই বারবার ঘাটতি ধরা পড়ায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে ব্যবস্থাপনা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, “জাহাজ থেকে ডিপো, ডিপো থেকে পাম্প—সব জায়গায় তেল চুরি হয়, এটা সবার জানা। পাইপলাইন করা হলো চুরি রোধে। তারপরও কিভাবে তেল গায়েব হয়? ট্যাংকের সক্ষমতা কমাতে যারা জড়িত তাদের শাস্তি হয়নি কেন? রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় আগে চুরি হয়েছে, কিন্তু এখন কেন হচ্ছে? নিরপেক্ষ নাগরিকদের দিয়ে বা আদালতের মাধ্যমে তদন্ত কমিশন গঠন করা উচিত।”
জ্বালানি তেল চুরি নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর গত মাসে জ্বালানিসচিবের সভাপতিত্বে বিপিসির কার্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়—শ্রমিক সংগঠনের দৌরাত্ম্য বন্ধে নজরদারি বাড়ানো, ডিপো ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা আনা এবং একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা। এই কমিটি পাইপলাইন, ট্যাংকের সক্ষমতা, মিটারিং ব্যবস্থাসহ সব কারিগরি ও অপারেশনাল বিষয় পরীক্ষা করে সুপারিশ দেবে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান জানিয়েছেন, পাইপলাইন এখনো প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্প হস্তান্তরের পর বিপণন কোম্পানিগুলো দুই প্রান্তের মিটারের ভিত্তিতে সরাসরি তেল বুঝে নেবে, তখন দায়িত্বও নির্দিষ্ট হবে।
পদ্মা ও মেঘনা ডিপোতে দেড় লাখ লিটারের এই ঘাটতি তেল পরিবহণ ব্যবস্থায় অব্যাহত অনিয়ম, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, পুরোনো অবকাঠামো এবং স্বচ্ছতা-সংকটের চিত্রই তুলে ধরেছে। তদন্ত সম্পন্ন হলে ঘাটতির প্রকৃত কারণ জানা যাবে—মিটার ত্রুটি, ট্যাংকের সক্ষমতায় ভুল, নাকি অন্য কোনো অনিয়ম—এখন সেদিকেই সবার নজর।











