পার্বত্য চট্টগ্রামে ছয় মাসে ২৪০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ: সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্তত ২৪০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময়ে অপহরণ, হত্যা, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, নারী নির্যাতন এবং শিশু-কিশোরদের জোরপূর্বক সংঘাতমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মতো নানা ঘটনা ঘটেছে, যা পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক জননিরাপত্তা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকালে বান্দরবান প্রেসক্লাবে "পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তা" শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মো. মজিবর রহমান। তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি, হত্যা, ভূমি দখল এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪্য৭টি অপহরণ এবং ১৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনচালক ও শিক্ষার্থীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের প্রবণতা বেড়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ৭০ জনের বেশি শিশু ও তরুণকে জোরপূর্বক তাদের সংঘাতময় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করেছে। পাশাপাশি অন্তত ১৪ জন নারী অপহরণ, প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়।
সংগঠনটির অভিযোগ, অবৈধ চাঁদাবাজি বর্তমানে কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর অন্যতম আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত এক বছরে পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ৫২০টি চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। কাঠব্যবসায়ী, ওষুধ কোম্পানি, পরিবেশক প্রতিষ্ঠান এবং পরিবহন খাতের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনারও উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে উন্নয়নকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মারধর করে চাঁদা দাবি, বান্দরবানে পণ্যবাহী ট্রাক আটকে অর্থ আদায় এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের চেষ্টার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া ভূমি দখল ও দখলচেষ্টার একাধিক ঘটনা, সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্ত্র ও মাদক পাচার, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, কিছু আঞ্চলিক সংগঠন আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সহানুভূতি ও সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অস্ত্র চোরাচালান ও সহিংস কর্মকাণ্ড আড়াল করতে রাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার কথাও বলা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা জোরদার, অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, ভূমিবিরোধের ন্যায্য সমাধান এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার দাবি জানায় পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, বান্দরবান জেলা নাগরিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য মো. নাছির উদ্দিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মো. শাহজালাল, বান্দরবান জেলা ছাত্র পরিষদের সভাপতি মো. আসিফ ইকবাল এবং সাধারণ সম্পাদক মো. তানভির হোসেন ইমন।
বক্তারা বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সকল নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মানবাধিকার রক্ষার পাশাপাশি আইনের সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং সকল নাগরিকের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।”











