মহেশখালীতে টার্মিনাল বিকল: দীর্ঘায়িত হচ্ছে বিষম গ্যাস সংকট, চরম ভোগান্তিতে গৃহস্থালি ও শিল্প

মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাওয়ায় দেশে চলমান গ্যাস সংকট অন্তত আরও এক মাস দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অন্তত ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় আবাসিক রান্নাঘর থেকে শুরু করে গণপরিবহন ও শিল্প উৎপাদনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে।
গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটের (এফএসআরইউ) বয়লার শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়। এর ফলে দুটি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানির যে সম্মিলিত সক্ষমতা ছিল, তার প্রায় অর্ধেক স্তব্ধ হয়ে যায়। ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ২২০ কোটি ঘনফুটে, যা মোট ঘাটতি বাড়িয়ে দাঁড় করিয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশে।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, বিদেশি প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে মেরামতকাজ শুরু হলেও চলতি মাসজুড়ে টার্মিনালটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, “একটি এফএসআরইউ বিকল থাকায় সার্বিক সরবরাহে যে বড় ধাক্কা লেগেছে, তা দ্রুত কাটানো সম্ভব হচ্ছে না। যন্ত্রাংশ সংস্থাপন ও নিরাপত্তা পরীক্ষার কারণে চলতি মাসে টার্মিনালটি চালু হওয়া অসম্ভব, আরও কিছুদিন সময় লাগবে।”
তিতাস গ্যাস অধিভুক্ত এলাকায় সংকট রূপ নিয়েছে ভয়াবহ রূপ। ১৯০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে তিতাস সরবরাহ পাচ্ছে মাত্র ১২০ কোটি ঘনফুট। তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান নিশ্চিত করেছেন যে, কক্সবাজারের মহেশখালী টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত এই বিশাল ঘাটতি মেটানোর অন্য কোনো বিকল্প উৎস নেই।
সংকটের সরাসরি আঘাত পড়েছে রাজধানীসহ সারাদেশের বাসাবাড়িতে। ভোর না হতেই রাজধানীর মগবাজার, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পুরান ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় চুলার গ্যাস নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। গভীর রাতের আগে গ্যাসের দেখা মিলছে না। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ে সিলিন্ডার গ্যাস ও ইনডাকশন চুলার দিকে ঝুঁকছেন সাধারণ মানুষ, যাতে মাস শেষে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দ্বিগুণ বিলের বোঝা টানতে হচ্ছে।
একই সাথে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে সড়ক পরিবহনে। রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ (পিএসআই) তলানিতে ঠেকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত হচ্ছে। চালকেরা পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন, যার প্রভাবে ট্রিপের সংখ্যা ও আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, সার কারখানা ও শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করায় বিঘ্নিত হচ্ছে সার্বিক উৎপাদন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় কূপ অনুসন্ধানে স্থবিরতা এবং আমদানিকৃত এলএনজির ওপর একক নির্ভরতাই আজকের এই সংকটের প্রধান কারণ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রাক্তন অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “একটি মাত্র ভাসমান টার্মিনাল বিকল হলেই গোটা দেশের অর্থনীতি জিম্মি হয়ে পড়ে—এই অবকাঠামোগত দুর্বলতা আমাদের আমদানিনির্ভর নীতিমালার ফল। নতুন কূপ খননের যে পদক্ষেপ এখন নেওয়া হচ্ছে, তা আরও পাঁচ বছর আগে নেওয়া উচিত ছিল।”










