মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিবিজড়িত শান্তিরহাট গজারিয়া খালের সেতুটি ধসে পড়ার শঙ্কা, ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে হাজারো মানুষ, পুনর্নি...
বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ন

মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিবিজড়িত শান্তিরহাট গজারিয়া খালের সেতুটি ধসে পড়ার শঙ্কা, ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে হাজারো মানুষ, পুনর্নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের

মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিবিজড়িত শান্তিরহাট গজারিয়া খালের সেতুটি ধসে পড়ার শঙ্কা, ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে হাজারো মানুষ, পুনর্নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের
ছবি সংগৃহীত।

ফটিকছড়ির ভূজপুর থানার ২ নম্বর দাঁতমারা ইউনিয়নের শান্তিরহাট বাজার, বেতুয়া, তারাখোঁ সড়কের গজারিয়া খালের ওপর নির্মিত ঐতিহ্যবাহী সেতুটি বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই সেতুটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৮ সালে দাঁতমারা ইউনিয়নের মেম্বার বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজু মিয়ার প্রচেষ্টায় সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। সে সময় এ অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে নির্মাণসামগ্রী আনা-নেওয়া ছিল কষ্টসাধ্য। নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ।

তৎকালীন এলাকার জনপ্রতিনিধি ফজু মিয়া মেম্বার ছিলেন সেতুটির অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি মুক্তিবাহিনীর সদস্য হওয়ায় পাক-হানাদার বাহিনী তাকে ধরে এনে নির্মাণাধীন তার স্বপ্নের এই সেতুর ওপর ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর সেতুটির কাজ সম্পন্ন হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবহেলা ও ভাঙনের কারণে এটি আজ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির পূর্ব পাশের অংশ মাঝখানে ফেটে অনেকটা নিচের দিকে দেবে গেছে। এ ছাড়া খালের পূর্ব পাশের বাঁধ ভেঙে মাটি সরে যাওয়ায় সেতুর গাইড ওয়াল ভেঙে দুই দিকে সরে গিয়ে গর্ত তৈরি হয়েছে। নিচে মূল পিলারগুলোতেও বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। অনেক স্থানে কংক্রিট খসে পড়ে রড বের হয়ে গেছে। খালের দুই পাড়ে ভয়াবহ ভাঙনের কারণে সেতুটির স্থায়িত্ব নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, এটি দাঁতমারা ইউনিয়নের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার মানুষের চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংযোগ। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভারী যানবাহন চলাচলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও বিকল্প সড়কের দূরত্ব বেশি হওয়ায় প্রতিদিন কার, মাইক্রোবাস, সিএনজি, চাঁদের গাড়ি ও মিনিট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন শান্তিরহাট উচ্চবিদ্যালয়, শান্তিরহাট মিশকাতুন্নবী দাখিল মাদ্রাসা, শান্তিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খাদিজাতুল কোবরা মহিলা মাদ্রাসা, ছোট বেতুয়া মাদ্রাসা, রহমানিয়া বালক-বালিকা মাদ্রাসাসহ অন্তত ৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সেতু পারাপার হচ্ছে।

সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা হলে বড় বেতুয়া, ছোট বেতুয়া, তারাখোঁ, চুড়ামণি, গড়াভাঙ্গা ও হাতিমারা এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। কৃষিপণ্য পরিবহন, বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জরুরি সেবাখাতে ব্যাপক সুবিধা সৃষ্টি হবে। সেতুটির পাশেই রয়েছে তারাখোঁ বন বিট, ফলে বন বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনাতেও সহজ হবে।

এ বিষয়ে দাঁতমারা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল হাকিম বলেন, “সেতুটি পুনর্নির্মাণের জন্য উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “দাঁতমারা ইউনিয়নের মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে। সামনের বর্ষায় পানির স্রোত বৃদ্ধি পেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”

এলাকাবাসীর দাবি, ইতিহাস, জনদুর্ভোগ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে গজারিয়া খালের ওপর একটি নতুন আধুনিক সেতু নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।




রাউজানে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেপ্তার

রাউজানে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেপ্তার
ছবি সংগৃহীত।

চট্টগ্রামের রাউজানে দুটি সাজা পরোয়ানাসহ পৃথক মামলায় জারি হওয়া মোট নয়টি পরোয়ানাভুক্ত দীর্ঘদিনের পলাতক আসামি এনামুল হক বাচা ওরফে বাচা কোম্পানিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ট্রমা সেন্টারের সামনের সড়কে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার এনামুল হক বাচা ওরফে বাচা কোম্পানি পূর্ব রাউজান এলাকার আজিজুল হক কোম্পানির বাড়ির মৃত আবদুল কাদেরের ছেলে।

রাউজান থানা-পুলিশ জানায়, চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বিপিএমের নির্দেশনায় রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. বেলায়েত হোসেন পিপিএম এবং রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলামের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ অভিযান পরিচালিত হয়।

এসআই (নিরস্ত্র) মো. দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে এএসআই (নিরস্ত্র) মো. ইকবাল হোসেনসহ পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনামুল হক বাচার বিরুদ্ধে দায়রা-৪৩৭/২৩, সিআর-৮৪০/২২ মামলায় এক বছরের সাজা পরোয়ানা এবং দায়রা-৯০১/২০২৪, সিআর-১৪০/২০২৩ মামলায় এক বছরের সাজা পরোয়ানা রয়েছে। এ ছাড়া জিআর-১০৮/২৫, সিআর-৫৭৬/২৫, দায়রা-১৯১৭/২২, সিআর-৬৮৪/২১, সিআর-১৫০/২০২৪, সিআর-৫৩০/২০২৪, সিআর-১৮৯/২০২৩ ও সিআর-১৮৮/২০২৩ মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

পুলিশ জানায়, পরোয়ানা জারির পর থেকে এনামুল হক বাচা দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার আসামিকে আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন থানার সেকেন্ড অফিসার উপপরিদর্শক মো. তানভীর।




রাউজানে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেখে পরীক্ষার্থীর মৃত্যু

রাউজানে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেখে পরীক্ষার্থীর মৃত্যু
ছবি সংগৃহীত।

চট্টগ্রামের রাউজানে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অকৃতকার্য হওয়ার সংবাদ পেয়ে মনি দাশগুপ্ত (১৮) নামে এক পরীক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (১০ আগস্ট) ফল প্রকাশের পরপরই উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের গশ্চি সুনীল মাস্টারের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।

তবে মনির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এলাকায় কৌতূহল ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এটি আত্মহত্যা বলে গুঞ্জন উঠলেও পরিবারের দাবি, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি বলে জানিয়েছে।

নিহত মনি দাশগুপ্ত একই বাড়ির মৃদুল দাশগুপ্তের মেয়ে। সে গশ্চি উচ্চবিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা শাখার ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষের অনিয়মিত এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল।

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক নুরুন নবী জানান, মনি এবার ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে গণিতে উত্তীর্ণ হলেও ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়। তিনি বলেন, ‘প্রথমে শুনেছি ফল প্রকাশের পর অকৃতকার্য হওয়ার সংবাদ পেয়ে সে আত্মহত্যা করেছে। পরে আবার কারও কাছে শুনলাম হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা কী, তা আমি জানি না।’

স্থানীয় কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফল প্রকাশের সময় মনির মা রেবা দাশগুপ্ত বাড়ির বাইরে রান্নার জন্য পাতা কুড়াতে গিয়েছিলেন। এ সময় মনি বাড়িতে রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিল। এক নিকটাত্মীয় এসে তাকে পরীক্ষার ফলাফলে অকৃতকার্য হওয়ার কথা জানান। এরপর মনি একটি কক্ষে একা চলে যায়। কিছুক্ষণ পর তার মা বাড়িতে ফিরে তাকে শয়নকক্ষে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে স্থানীয়রা জানান। তিনি চিৎকার দিলে স্বজনরা ঘটনাস্থল থেকে তাকে উদ্ধার করে পথেরহাটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে দ্রুত তার সৎকার সম্পন্ন করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

নিহতের মা রেবা দাশগুপ্ত বলেন, ‘আমি পাতা কুড়াতে গিয়েছিলাম। ঘরে এসে দেখি অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। পথেরহাট হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ফল প্রকাশের দশ মিনিটের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটেছে। এবার শুধু দুটি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। তাই বলে এমন হবে, তা আমি ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি। আগে জানলে আমি বাইরে যেতাম না।’

তবে তিনি মেয়ের আত্মহত্যার বিষয়টি এড়িয়ে যান। তাঁর দাবি, ফল প্রকাশের পর অকৃতকার্য হওয়ার সংবাদ শুনে তাঁর মেয়ে স্ট্রোক করে মৃত্যুবরণ করেছে। এর বাইরে তিনি কিছুই জানেন না এবং বলতেও পারবেন না।

এদিকে মনি আত্মহত্যা করেছে—এমন কোনো খবর সোমবার পুলিশ পায়নি বলে জানিয়েছেন নোয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে আত্মহত্যা করেছে এমন কোনো সংবাদ গতকাল আসেনি। তবে আজ (মঙ্গলবার) শুনেছি। বিষয়টি যাচাই করে দেখা হচ্ছে।’

মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত না হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা চলছে। পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।




নারায়ণহাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়: শিক্ষকসংকট ও অব্যবস্থাপনায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত; দুই বছর ধরে এসএসসিতে পাস নেই

নারায়ণহাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়: শিক্ষকসংকট ও অব্যবস্থাপনায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত; দুই বছর ধরে এসএসসিতে পাস নেই
ছবি সংগৃহীত।

একসময় প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর ছিল বিদ্যালয়টি। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে কমতে এমন পর্যায়ে নেমেছে যে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র তিনজন। তাদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। আগের বছরও একই অবস্থা ছিল।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নারায়ণহাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে টানা দুই বছর ধরে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার শূন্য। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে মোট পাঁচজন শিক্ষার্থী অংশ নিলেও উত্তীর্ণ হতে পারেনি একজনও। চলতি বছর পরীক্ষায় অংশ নেয় তিনজন—মানবিক বিভাগের দুজন ও বিজ্ঞান বিভাগের একজন।

তিনজনই অনুত্তীর্ণ হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই শিক্ষার্থীরও একই পরিণতি হয়েছিল।

ফলে টানা দুই বছর পাসের হার শূন্য হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়টির এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পুরো ক্যাম্পাস প্রায় জনশূন্য। ফল প্রকাশের পরদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিল মাত্র দুজন ছাত্রী। শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতিও ছিল খুবই কম। বিদ্যালয়ের কাগজপত্র অনুযায়ী শিক্ষক রয়েছেন আটজন। তবে ওই দিন প্রধান শিক্ষকসহ উপস্থিত ছিলেন মাত্র দুজন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এসএসসির ফলাফল বিপর্যয় নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা বিদ্যালয়ে আসতে পারেন—এমন আশঙ্কায় অন্য কয়েকজন শিক্ষক সেদিন বিদ্যালয়ে আসেননি। তাই অনুপস্থিত শিক্ষকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বিবি মরিয়ম শান্তা বলে, শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস হয় না। বাংলার শিক্ষক থাকলেও গণিত ও ইংরেজির শিক্ষক নেই। ফলে পড়াশোনায় বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে।

শান্তা বলে, "শিক্ষকেরা নিয়মিত থাকলে ঠিকমতো পড়ালেখা হতো। আমরাও পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারতাম। এখন সবাই ফেল করছে, কেউ পাস করছে না। আগে স্কুলটা ভালো ছিল। আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই, তখন অনেক শিক্ষার্থী ছিল। এখন বলতে গেলে কোনো শিক্ষার্থীই নেই।"

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসমা আকতার বলে, "স্কুলে শুধু শিক্ষকসংকট নয়, পানের যোগ্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও নেই। বিদ্যালয়ে কোনো টিউবওয়েল না থাকায় পানি সংগ্রহের জন্য পাশের বাড়িতে যেতে হয়।"

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে ৮৪ শতক জমির ওপর স্থানীয় কয়েকজনের উদ্যোগে শওকত সিকদার নামে এক ব্যক্তি নারায়ণহাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ অঞ্চলে নারীশিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ২০০৪ সালে পাঠদানের অনুমোদন পায়। ২০০৬ সালে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এবং ২০০৮ সালে পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পার হলেও বিদ্যালয়টি এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এমপিওভুক্ত না হওয়ায় বিদ্যালয়ের আর্থিক সংকট দীর্ঘদিনের। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থী ধরে রাখার ক্ষেত্রে।

এসএসসির ফলাফলের পরিসংখ্যানও সেই সংকটের চিত্র তুলে ধরে। ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিদ্যালয়টি থেকে মোট ২৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ আগের বছরগুলোতে ফলাফল একেবারে খারাপ ছিল না। কিন্তু ২০২৫ সালে দুই পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করেনি। ২০২৬ সালে পরীক্ষার্থী বেড়ে তিনজন হলেও ফলাফলের কোনো উন্নতি হয়নি।

বিদ্যালয়টির জন্য শুধু পাসের হার শূন্য হওয়াই উদ্বেগের বিষয় নয়; তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, কেন বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং কেন শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানটির ওপর আস্থা হারাচ্ছে।

বিদ্যালয়ের সত্তরোর্ধ্ব প্রধান শিক্ষক সুখেন্দ্র বিকাশ দে বলেন, শিক্ষকসংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে এনটিআরসিএর মাধ্যমে দক্ষ ও মানসম্মত শিক্ষক পাওয়া যাবে। এতে পাঠদানের মানও বাড়বে। বর্তমানে শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনা দিতে না পারায় তাঁদের ওপর সেভাবে চাপ প্রয়োগ করাও সম্ভব হয় না।

নিজের বয়স ও নানা সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, এ অঞ্চলের নারীশিক্ষার কথা বিবেচনা করেই তিনি প্রতিষ্ঠানটি ধরে রেখেছেন। বৃদ্ধ বয়সেও নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

ফটিকছড়ি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষক-কর্মচারী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফলও আসছে না।

তিনি বলেন, "একজন বয়োবৃদ্ধ প্রধান শিক্ষক নিজের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি ধরে রেখেছেন। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছি।"

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। কী কী সমস্যার কারণে বিদ্যালয়টিতে এমন ফলাফল হচ্ছে, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।