লক্ষ্মীছড়ির রাবেয়া বেগম: অদম্য নারী, সফল মা হওয়ার সংগ্রামী পথচলা
জীবনযুদ্ধে অদম্য সাহস ও পরিশ্রমের প্রতীক রাবেয়া বেগম (৬৫)। স্বামী আব্দুল হামিদ শেখ ও চার ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে ১৯৯৫ সালে লক্ষ্মীছড়ি গুচ্ছগ্রামে তাঁদের নতুন সংসার শুরু। বেগম রোকেয়া দিবসে এই জীবনসংগ্রামী নারীকে দেওয়া হয়েছে “অদম্য নারী সম্মাননা।
মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা এই নারী পরিবারটিকে টেনে নিয়ে গেছেন নিজের দুই হাতের পরিশ্রমে। স্বামী আর্মি ক্যাম্পে কাজ নিতেন, আর রাবেয়া বেগম ঘরে বসে সেলাই কাজ করতেন। কুটির শিল্প থেকে সেলাই শেখা, তারপর বাজার থেকে কাপড় এনে বাসায় শেলাই করে আয়। মাসে স্বামীর ৯০০ টাকার আয়ের পাশাপাশি সপ্তাহে ৩০০–৫০০ টাকা আয় করেই চলতো সংসার।
স্বামী ক্যাম্প থেকে অবশিষ্ট খাবার নিয়ে এলে সংসারের বড় একটি চাহিদাই মিটে যেতো—আর বাকি সব চাপ যেতো রাবেয়া বেগমের কাঁধে। সন্তানদের শিক্ষা কখনো বন্ধ হতে দেননি। গরু পালন করে জমি কেনা, এই কষ্টের দিনগুলোই ছিলো ভবিষ্যতের ভিত্তি।
১৯৯৯ সালে বড় ছেলে প্রথম বিভাগে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করে। পর্যায়ক্রমে অন্য সন্তানরাও লেখাপড়ায় সফলতা দেখায়। কিন্তু ২০০২ সালে স্বামীর ব্রেন স্ট্রোক পরিবারের ওপর পাহাড়সম বোঝা হয়ে আসে। স্বামী পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হলে ঘরের দায়িত্ব পড়ে সেজো ছেলের ওপর। সেই সঙ্গে রাবেয়া বেগমের রাত জেগে সেলাই করে সংসার টিকিয়ে রাখা, এটাই ছিলো তাদের টিকে থাকার শক্তি।
ক্রমে বড় ও মেঝো ছেলে চট্টগ্রামে গিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করেন। বড় ছেলে পল্লী চিকিৎসার কোর্স করে লক্ষ্মীছড়িতে ওষুধের দোকান খোলে, সেঝো ছেলে কম্পিউটার শিখে দোকান দেয়। পরে গরু বিক্রি করে বাজারে জায়গা কিনে সেখানে ব্যবসা দাঁড় করান।
২০১২ সালের দিকে মেঝো ও সেজো ছেলে খাগড়াছড়িতে প্রোডাক্ট মার্কেটিং, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ফার্মেসি ও কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। ওয়েব ডেভেলপমেন্টে দক্ষ হয়ে মেঝো ছেলে “এডুলাইফ আইটি” প্রতিষ্ঠা করে, যা বর্তমানে খাগড়াছড়ির অন্যতম বৃহৎ আইটি প্রতিষ্ঠান। তাঁদের অধীনে এখন প্রায় ৪০ জন কর্মী কাজ করছেন।
বড় ছেলে মানিকছড়িতে ওষুধের ব্যবসা করছেন, ছোট ছেলে একটি ওষুধ কোম্পানির রিজিওনাল ম্যানেজার এবং পাশাপাশি লক্ষ্মীছড়িতেও ব্যবসা রয়েছে। ছোট মেয়ে ঢাকার হামদর্দ মেডিকেল কলেজে শেষ বর্ষে পড়ছেন।
সবশেষে রাবেয়া বেগম বলেন, আমার সন্তানদের মানুষ করতে অনেক কষ্ট করেছি, তারা সেই কষ্টের মূল্য দিয়েছে। তারা যেমন আদর্শবান হয়েছে, তেমন মানুষের কল্যাণেও কাজ করছে। তাই মনে হয়, আমি সত্যিই একজন সফল মা। এই সম্মাননা পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি।











