উন্নয়নে পিছিয়ে উত্তর সাতকানিয়া: বঞ্চনা নিরসনে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামোর দাবি জোরালো

দক্ষিণ চট্টগ্রামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে উত্তর সাতকানিয়া। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, চট্টগ্রাম-বান্দরবান এবং চট্টগ্রাম-বাঁশখালী সড়কের সংযোগস্থল হওয়ায় এই অঞ্চলটি অর্থনীতি ও রাজনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। তবে দীর্ঘকাল ধরে চলা এই অবহেলার অবসান ঘটাতে এখন সংসদীয় আসনের পুনর্বিন্যাস ও স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে নতুন উপজেলা বা থানা গঠনই এখন একমাত্র সমাধান। এক সময় এই দাবিতে গণআন্দোলন গড়ে উঠলেও দাবি আদায় না হওয়ায় পুনরায় সক্রিয় হওয়ার কথা ভাবছেন আন্দোলনকারীরা।
উপজেলা নির্বাচন অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৪ হাজার ১৮৫ জন। এর মধ্যে ৬টি ইউনিয়নের ১ লাখ ৭ হাজার ৯১৬ জন ভোটারকে নিয়মিত প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাতকানিয়ার ভোটাররা বর্তমানে দুটি আলাদা সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত। ২৯১-চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া) আসনের সাথে যুক্ত রয়েছে খাগরিয়া, কেওচিয়া, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, বাজালিয়া এবং পুরানগড় ইউনিয়ন। বাকি ১১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা ২৯২-চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া) আসনের অন্তর্ভুক্ত।
মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ১১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ভোটাররা চট্টগ্রাম-১৫ আসনের অধীনে স্বস্তিতে থাকলেও চট্টগ্রাম-১৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত ৬টি ইউনিয়নের বাসিন্দারা চরম অসন্তোষের মধ্যে রয়েছেন। উপজেলা ও থানা প্রশাসনের কাজ কিংবা সংসদ সদস্যকেন্দ্রিক কার্যক্রমে তারা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামের দেওয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত খাগরিয়ায় ২৫ হাজার ১৬১ জন, কেওচিয়ায় ২২ হাজার ৭১৩ জন, কালিয়াইশে ১৭ হাজার ১৮৭ জন, ধর্মপুরে ১১ হাজার ৩৪২ জন, বাজালিয়ায় ১৫ হাজার ৪৩৯ জন এবং পুরানগড় ইউনিয়নে ১৬ হাজার ৭৪ জন ভোটার রয়েছেন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের অধীনে চরতী ইউনিয়নে ২৭ হাজার ৪৫১ জন, নলুয়ায় ১৬ হাজার ৮০৩ জন, কাঞ্চনায় ২০ হাজার ৫৭১ জন, আমিলাইষে ১০ হাজার ৭৮৩ জন, এওচিয়ায় ২০ হাজার ৯১৬ জন, মাদার্শায় ১২ হাজার ৪৩৩ জন, ঢেমশায় ১৩ হাজার ৮৬১ জন, পশ্চিম ঢেমশায় ৭ হাজার ৩৫ জন, ছদাহায় ৩০ হাজার ৯৮৬ জন, সদর ইউনিয়নে ২৬ হাজার ৪৯২ জন, সোনাকানিয়ায় ২৩ হাজার ৩৬১ জন এবং পৌরসভায় ৪৫ হাজার ৫৭৭ জন ভোটার রয়েছেন।
সাতকানিয়া উপজেলার প্রায় ২৮২.৪০ বর্গকিলোমিটারের এই বিশাল জনপদে প্রায় ৭ লাখ মানুষের বসবাস। কিন্তু সীমিত লোকবল ও সরঞ্জামের অভাবে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে থানা ও উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, সাতকানিয়ায় যে পরিমাণ বরাদ্দ প্রয়োজন, সে তুলনায় প্রাপ্তি খুবই সামান্য। অন্যদিকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুরুল হক জানান, ব্যবসায়িক ও পেশাগত কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি অন্য এলাকার প্রচুর মানুষ এখানে বসবাস করে, যাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্যরা অধিকাংশ সময় চন্দনাইশ কেন্দ্রিক উন্নয়নে মনোযোগী থাকেন, যার ফলে সাতকানিয়ার এই অংশটি অবহেলিত থেকে যায়। পাশাপাশি একই উপজেলায় দুইজন সংসদ সদস্যকে প্রটোকল দেওয়া এবং তাদের সুপারিশ সমন্বয় করতে গিয়ে প্রশাসনকেও বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। এ সমস্যা সমাধানে চিন্তাশীল মহলের প্রস্তাব হলো, সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভাকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র সংসদীয় আসন করা অথবা ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে কেরানিহাট কেন্দ্রিক আলাদা উপজেলা বা থানা গঠন করা। একজন নারী সংগঠকের মতে, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়া যদি ৯টি করে ইউনিয়ন নিয়ে উপজেলা হতে পারে, তবে সাতকানিয়ার উত্তর অংশ নিয়ে নতুন উপজেলা গঠন করলে উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হবে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী শফিকুল ইসলাম রাহী (সিআইপি) জানান, উত্তর সাতকানিয়ার ৬টি ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে একটি প্রশাসনিক থানা এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা গঠনের সব ধরনের উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করবেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংবাদকর্মীরাও একই সুরে কথা বলছেন। তাদের মতে, উত্তর সাতকানিয়া আলাদা প্রশাসনিক ইউনিট হলে বৈষম্য দূর হবে। সচেতন নাগরিকদের প্রস্তাব হলো, খাগরিয়া, কেওচিয়া, কালিয়াইশ, বাজালিয়া, পুরানগড় ও ধর্মপুরের সাথে ছদাহা, ঢেমশা ও নলুয়া ইউনিয়নকে যুক্ত করে নতুন উপজেলা গঠন করা হোক। এতে নতুন উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা হবে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৬ জন এবং মূল সাতকানিয়া উপজেলায় ভোটার থাকবে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬১৯ জন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জনমত ও প্রশাসনিক পরিকল্পনার সংবাদ পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হবে।











