কী আছে চট্টগ্রাম বন্দরের এই টার্মিনালে, কেন এত আলোচনা
বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৩৩ পূর্বাহ্ন

কী আছে চট্টগ্রাম বন্দরের এই টার্মিনালে, কেন এত আলোচনা

কী আছে চট্টগ্রাম বন্দরের এই টার্মিনালে, কেন এত আলোচনা
ছবি সংগৃহীত।

চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান চারটি টার্মিনালের (জিসিবি, এনসিটি, সিসিটি ও পিসিটি) মধ্যে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। এর ওপর ভর করেই বন্দরের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় হয়। তাই অনেকে এনসিটিকে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ও বলে থাকেন। এজন্য এটি পেতে শেখ হাসিনা সরকারের সময় থেকে অন্তর্বর্তী সরকার পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড। এ আলোচনার মাঝে দেশীয় কোম্পানি এমজিএইচ প্রস্তাবনার পর আরও তিন কোম্পানি একটি কনসোর্টিয়াম করে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে সরকারের কাছে। শেষ পর্যন্ত পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে যাচ্ছে, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। ইতিমধ্যে দেশি-বেদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনার কাজ পেতে সরকারকে প্রস্তাবনা দিয়েছে। এখন চলছে যাচাই-বাছাই। শেষ পর্যন্ত কে পাচ্ছে, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে দীর্ঘদিন ধরে এনসিটি ইজারা নিয়ে আন্দোলনে থাকা শ্রমিক সংগঠনগুলো ইজারার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আবারও সরব হচ্ছে। তাদের দাবি, স্বয়ংসম্পূর্ণ এনসিটি বর্তমানে নৌবাহিনীর হাতে ভালোই চলছে।


এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড, কসমস এন্টারপ্রাইজ এবং এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড নিয়ে গঠিত তিন দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়ামও প্রস্তাব দিয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে এই কনসোর্টিয়ামের পক্ষ থেকে ১৫ বছরের জন্য এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাবটি দেওয়া হয়। বিষয়টি সম্প্রতি জানাজানি হয়।

গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) এক চিঠিতে এনসিটি ইজারায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় সরকার। এই নির্দেশনা সামনে আসার পর প্রায় দেড় মাস আগের দেশীয় প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়টি জানা গেলো। সাইফ পাওয়ার টেক ২০০৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। তার সঙ্গে নতুন করে দুই প্রতিষ্ঠান সঙ্গী হলো।

এ কনসোর্টিয়ামের দেওয়া প্রস্তাবে বলা হয়, প্রতি একক কনটেইনার পরিচালনা বাবদ ৬৯ ডলার চেয়েছে এই তিন কোম্পানির জোট। আর জাহাজ ও কনটেইনার সংক্রান্ত সব মাশুল আদায় করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে আগামী ১৫ বছর জ্বালানি, বিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল খরচসহ কোনও ধরনের পরিচালনা ব্যয় ছাড়াই প্রতি একক কনটেইনারে প্রায় ৯২ ডলার রাজস্ব বন্দর পাবে বলে ওই প্রস্তাবে বলা হয়।

এ প্রসঙ্গে সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘমেয়াদে এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছি, ইজারা নয়। এই সময়ে মাশুল আদায় করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। দেশীয় প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনা করলে দেশের সক্ষমতা বাড়বে। “সবার আগে বাংলাদেশ” ধারণার আলোকেই আমরা প্রস্তাব দিয়েছি।’

আলোচনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড

গত ৪ জুন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখা থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের বরাবরে জারি করা পৃথক দুটি চিঠিকে ঘিরে আবারও আলোচনায় স্থান পেয়েছে দুবাই ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’। ওই দিন সকালে জারি করা প্রথম চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নেওয়া অথবা তা বাতিলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। তবে একই দিন কয়েক ঘণ্টা পর বিকালে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা ও দর কষাকষি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং গর্ভমেন্ট টু গর্ভমেন্ট (জিটুজি) কাঠামোর অধীনে এনসিটি পরিচালনার কাজ দুবাইভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় ওই উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আবার এই প্রক্রিয়া গতিশীল হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এ বিষয়ে চুক্তি হয়ে যাওয়ার জোর আলোচনা শুরু হলে আন্দোলনে যান বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটিতে বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি বছরের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্ল্যাটফর্মের সভায় আবার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এনসিটির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) যুক্ত করে সমন্বিত টার্মিনাল হিসেবে পরিচালনার প্রস্তাব দেয় ডিপি ওয়ার্ল্ড।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের ক্ষেত্রে সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) ও গর্ভমেন্ট টু গর্ভমেন্ট (জিটুজি) কাঠামোর আওতায় ১৫ বছরের জন্য পুরো টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে ইজারার প্রস্তাব রয়েছে। এই ব্যবস্থায় টার্মিনাল পরিচালনা, মাশুল আদায় ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দায়িত্ব থাকবে অপারেটরের হাতে। বিনিময়ে বন্দর শুধু নির্ধারিত রাজস্ব পাবে।

বর্তমানে এনসিটি পরিচালনা করছে কে

বন্দরের চারটি সচল কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বর্তমানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। ২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়ছে।

সর্বশেষ গত মে মাসে ১ লাখ ২৬ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় ৯৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই টার্মিনালে একসঙ্গে চারটি বড় কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো যায়। এখানে রয়েছে বিশ্বমানের গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। এনসিটির বার্ষিক সক্ষমতা ১১ লাখ টিইইউস হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৩ লাখ ৩০ হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে, যা নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে ১৪ শতাংশ বেশি।

কারা চালাচ্ছে বন্দরের বাকি তিন টার্মিনাল

বন্দরের অন্য টার্মিনালগুলোর মধ্যে চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনা করছে সাইফ পাওয়ার টেক। জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) পরিচালনা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেই। আর পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা করছে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটিই)। ২০২৪ সালের জুন থেকে বিদেশি এই প্রতিষ্ঠানটি পিসিটি পরিচালনা করছে এবং চুক্তি অনুযায়ী নিজস্ব সরঞ্জাম ব্যবহার করে ২২ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা না দেওয়ার দাবি স্কপের

এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা না দেওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। গত বুধবার (১০ জুন) চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান স্কপের নেতারা। পরে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন তারা।

স্কপের যুগ্ম আহ্বায়ক এস কে খোদা তোতন বলেন, ‘এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড সক্রিয় হলে ফের কঠোর আন্দোলনে যাবো। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আন্দোলনের মুখে বিদেশিদের বন্দর দেওয়া থেকে সরে গিয়েছিল। নতুন করে আবার তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে শুনছি। এটি আমরা মেনে নেবো না।’

বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘এ বিষয়ে নৌ মন্ত্রণালয়ের দুটি চিঠি আমাদের বিস্মিত করেছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আন্দোলনের মুখে এই উদ্যোগ থেকে সরে এলেও বর্তমান সরকার কেন আবার বিষয়টি সামনে আনছে, তা বোধগম্য নয়। এনসিটি দেশের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ পরিচালনা করে এবং এর আয়ও রেকর্ড পরিমাণ। বর্তমান সরকার যদি বিদেশিদের কাছে এনসিটি দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে পুনরায় আন্দোলন শুরু হবে।’

যা বললেন বন্দরের সচিব

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এনসিটি নিয়ে বন্দরে নতুন কোনও নির্দেশনা আসেনি। দেশীয় নাকি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করবে মন্ত্রণালয়। কথাবার্তা সবই চলছে মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত দেবে আমরা তা বাস্তবায়ন করবো।’

কেন এত আলোচনা

মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ভিত্তিক বৈশ্বিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এই টার্মিনালটি দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ, এর বিপরীতে দেশীয় অপারেটরদের প্রতিযোগিতার কারণেই এটি নিয়ে এত আলোচনা চলছে। আবার এটি দেশের সবচেয়ে বড় ও লাভজনক টার্মিনাল। বন্দরের সর্ববৃহৎ এবং আধুনিক কনটেইনার টার্মিনালও। বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানো-নামানোর (হ্যান্ডলিং) প্রায় ৪৪ থেকে ৫০ শতাংশ একাই সামলায় এনসিটি। বন্দরের তৈরি একটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও পুরোদমে সচল ও লাভজনক সম্পদ, যা থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। এজন্য সবাই পেতে চায়।

সমালোচক ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, এটি একটি সম্পূর্ণ সচল টার্মিনাল যেখানে নতুন করে বড় কোনও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। তাই তৈরি করা লাভজনক সম্পদ নিয়ে সবাই লাভবান হতে চাচ্ছে। এ অবস্থায় কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে আপত্তি উঠছে বারবার। এ ছাড়া বিদেশি অপারেটর দায়িত্ব নিলে স্থানীয় প্রায় ৩ হাজার ৮০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে, এই আশঙ্কায় বন্দর শ্রমিক ও কর্মচারীরা দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করছেন।




৪২ শীর্ষ ঋণখেলাপির পাচারের অর্থ উদ্ধারে মাঠে নামছে ৮ আন্তর্জাতিক সংস্থা

৪২ শীর্ষ ঋণখেলাপির পাচারের অর্থ উদ্ধারে মাঠে নামছে ৮ আন্তর্জাতিক সংস্থা
ছবি সংগৃহীত।

ব্যাংক খাত থেকে লুটে নেওয়া ও বিদেশে পাচার করা হাজার হাজার কোটি টাকা ফেরত আনতে এবার বড় ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শীর্ষ ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর পর দেশের আরও ৪২টি বড় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও দেশে ফিরিয়ে আনতে মাঠে নামছে বিশ্বখ্যাত আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও তদন্তকারী সংস্থা।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১২টি দেশে গোপনে গড়ে তোলা সম্পদের অবস্থান চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ উদ্ধারে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চুক্তি ও কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে ওই সব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া ৩৮টি ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে উপস্থিত দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা উপস্থিত ছিলেন। বিদেশে সম্পদ উদ্ধারে যেসব ব্যাংক এখনো ওই আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেনি, তাদের দ্রুত তা সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) ডাটাবেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খেলাপির তালিকায় থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিদেশে অর্থ পাচারের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে এসবি এক্সিম গ্রুপ, হাবিব গ্রুপ, ইয়াসীর গ্রুপ, এডব্লিউআর গ্রুপ, লিবার্টি গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, লস্কর গ্রুপ ও সাদ মুসা গ্রুপের মতো বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী রয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তাদের পাচার করা সম্পদ মূলত যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে।

অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের এ তৎপরতায় যুক্ত হওয়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো হলো– গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রোল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।

সম্পদ পুনরুদ্ধারের এই কার্যক্রমে কোনো ব্যাংককে আগাম কোনো অর্থ দিতে হবে না। পুরো বিষয়টি পরিচালিত হবে ‘নো উইন, নো পে’ নীতিতে। অর্থাৎ বিদেশি পরামর্শক সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে সম্পদ অনুসন্ধান করবে ও আইনি লড়াই চালাবে। পরবর্তী সময়ে উদ্ধার হওয়া সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ তারা পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে।
সম্পদ উদ্ধারের পুরো আইনি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, প্রথম ধাপে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সংস্থাগুলো বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান ও আর্থিক পরিমাণ চিহ্নিত করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী প্রথমে সেই সম্পত্তি ফ্রিজ বা জব্দ করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে আদালতের নির্দেশে এসব সম্পত্তি বিক্রি বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ বাংলাদেশে ফেরত এনে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ সমন্বয় করা হবে।

বৈঠক শেষে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বাইরে চলে গেছে এবং তা ফেরত আনতে ব্যাংকগুলো একযোগে কাজ শুরু করেছে। অর্থ উদ্ধার ছাড়াও পাচারের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে যেন এমন লুটপাট না ঘটে, সে বিষয়টিতেও জোর দেওয়া হচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দফায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং শীর্ষ ১০টি বিতর্কিত শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে যৌথ তদন্ত শুরু হয়। এনবিআরের সিআইসি, সিআইডি ও দুদকের যৌথ প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে দেশে-বিদেশে তাদের প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এবার দ্বিতীয় দফায় এই ৪২ খেলাপির বিরুদ্ধে একই কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
 




ট্যুর অপারেটরদের বড় সুবিধা: বিদেশে ঘুরতে ডলারের ঝামেলা শেষ, টাকায় মিলবে ভ্রমণ প্যাকেজ

ট্যুর অপারেটরদের বড় সুবিধা: বিদেশে ঘুরতে ডলারের ঝামেলা শেষ, টাকায় মিলবে ভ্রমণ প্যাকেজ
ছবি সংগৃহীত।

বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ কিনতে এখন আর সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে ভাবতে হবে না বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের। ভ্রমণ প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এখন থেকে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) নিবন্ধিত সদস্য ট্যুর অপারেটররা ভ্রমণকারীদের কাছ থেকে টাকায় অর্থ গ্রহণ করে বিদেশে প্যাকেজ বিক্রি করতে পারবেন। সংগৃহীত অর্থের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সরাসরি বিদেশে সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারীদের কাছে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

রোববার (৯ আগস্ট) এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব টোয়াব সদস্য ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে বিদেশি ট্যুর অপারেটর, হোটেল বা ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির বৈধ চুক্তি কিংবা ব্যবসায়িক সমঝোতা রয়েছে, তারা এ সুবিধার আওতায় আসবেন। তাদের আবেদনক্রমে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো বিদেশে আবাসন, পরিবহনসহ প্রকৃত ভ্রমণসেবার বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে পারবে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, নিয়মিত বার্ষিক ভ্রমণ কোটার বাইরে একজন ভ্রমণকারীর জন্য প্রতি ক্যালেন্ডার বছরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যাবে। এ ক্ষেত্রে ভ্রমণকারীর পাসপোর্ট নম্বরের বিপরীতে লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে ট্যুর অপারেটরকে।

এ ছাড়া ভ্রমণকারীর কাছ থেকে লিখিত ঘোষণা নিতে হবে যে, অন্য কোনো ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে তিনি নির্ধারিত বার্ষিক সীমা অতিক্রম করেননি। তবে ৩ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের প্যাকেজের ক্ষেত্রেও সুযোগ রাখা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্যাকেজের মূল্য আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় সংগ্রহ করতে হবে। এ ধরনের লেনদেনে এডি ব্যাংকগুলো অ্যাকোয়ারিং সেবা দিতে পারবে।

বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট ইনভয়েস, চুক্তি, বিস্তারিত ভ্রমণসূচি, ভ্রমণকারীদের তালিকা এবং টাকায় অর্থ গ্রহণের প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করতে হবে এডি ব্যাংকগুলোকে। বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর সাত দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত বিবরণীও জমা দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নীতিগত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন পর্যটন খাতের উদ্যোক্তারা। তারা মনে করছেন, টাকায় বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ কেনার সুযোগ চালু হওয়ায় গ্রাহকদের জন্য লেনদেন আরও সহজ হবে এবং এতে স্বচ্ছতা আসবে। এটি দেশের আউটবাউন্ড ট্যুরিজম খাতের বিকাশ ঘটাতে এবং ট্যুর অপারেটিং ব্যবসাকে আরও গতিশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।




বাংলা কিউআর ব্যবহারে চাঁদাবাজি ও জাল নোটের ঝুঁকি কমবে : গভর্নর

বাংলা কিউআর ব্যবহারে চাঁদাবাজি ও জাল নোটের ঝুঁকি কমবে : গভর্নর
ছবি সংগৃহীত।

বাংলা কিউআর ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে চাঁদাবাজি ও জাল নোটের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি নগদ টাকা পরিবহনের ঝুঁকিও কমবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

শনিবার (৮ আগস্ট) চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলে বাংলা কিউআর লেনদেন বিষয়ক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থার (আইএফসি) মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় পরিচালিত ‘ক্যাশলেস ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে ২০ জন নারী মার্চেন্টসহ প্রায় ১২০ জন বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী মার্চেন্ট অংশ নেন।

গভর্নর বলেন, বর্তমানে দেশে মাসে এক কোটি লেনদেন হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যে দৈনিক এক কোটি লেনদেনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তিনি বলেন, বর্তমানে ছয় কোটি মানুষ বাটন ফোন ব্যবহার করেন। তাদের হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ও ইন্টারনেট সুবিধা না থাকাকে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গ্রাহকদের স্বল্পমূল্যে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল সরবরাহের বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে।

মোস্তাকুর রহমান বলেন, ডিজিটাল পেমেন্ট নিশ্চিত হলে ব্যবসায়ীরা কর্মচারীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। এতে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে, জাল নোটের ঝুঁকি কমবে এবং নগদ টাকা পরিবহনের ঝুঁকি হ্রাস পাবে।

তিনি আরও বলেন, টাকা ছাপাতে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন বাড়ানো গেলে এই ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিমূলক পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রয়োজন। বাংলা কিউআর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ২৪ লাখ মার্চেন্ট বাংলা কিউআর ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ লেনদেন হচ্ছে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। কর ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত বাড়াতেও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থার (আইএফসি) প্রতিনিধি হাসান শাহরিয়ার বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল মাসে ২০ লাখ লেনদেন। বর্তমানে মাসে এক কোটি লেনদেন হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি সাড়া পাচ্ছি। বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের অগ্রযাত্রায় আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের নির্বাহী পরিচালক মো. হানিফ মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কর্মশালায় বাংলা কিউআরের ব্যবহার পদ্ধতি, সুবিধা, প্রয়োজনীয়তা ও সচেতনতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগ-১-এর অতিরিক্ত পরিচালক মো. পারওয়েজ আনজাম মুনির, যুগ্মপরিচালক জুয়েল মজুমদার ও মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন তিনটি অধিবেশন পরিচালনা করেন।

পরে বাংলা কিউআর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, আন্তঃসীমান্ত লেনদেন ব্যবস্থা চালু, লেনদেনের খরচ কমানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে মার্চেন্টদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন গভর্নর।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের পরিচালক (প্রশাসন) স্বরূপ কুমার চৌধুরী, পরিচালক (পরিদর্শন) মো. নুরুল আলম, পরিচালক (ব্যাংকিং) ইয়াসমিন রহমান বুলা, পরিচালক (বৈদেশিক মুদ্রা) মাহবুবুল রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলা কিউআর বাস্তবায়ন ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।