জনবহুল সড়ক বেহাল, বরাদ্দের টাকা খরচ হচ্ছে নির্জন পথে!

- কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে অস্বচ্ছতা
- নাম ভুল, কাজ ভুল—এলজিইডির প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় বড় প্রশ্ন
- পাহাড় কাটায় পরিবেশ অনুমতি নেই—তবুও চলছে সড়ক নির্মাণ!
- প্রকল্পের নামে ব্যক্তিস্বার্থ—রিসোর্ট ও বাগানেই সুবিধা পাচ্ছে নতুন সড়ক
- পর্যটন উন্নয়ন নাকি সরকারি অর্থ অপচয়; টাইগার পাড়া–রুপালি ঝরনা সড়ক নিয়ে বিতর্ক
বান্দরবানের নীলাচল সড়কে জনবসতিবহুল 'যৌথ খামার এলাকা থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন' শিরোনামে উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এক ওটিএম টেন্ডার আহ্বান করেছিল। প্রকল্পে উল্লেখ ছিল মোট ৩ কিলোমিটার ২৭০ মিটার সড়ক উন্নয়নের কাজ। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে টেন্ডারে উল্লেখিত সড়ক নয়, বরং উন্নয়ন কাজ চলছে সম্পূর্ণ জনবসতিহীন এলাকায়।
টাইগার পাড়া হয়ে সিনিয়র পাড়া পর্যন্ত জনবসতিশূন্য এলাকায় প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ এই সড়কের দু’পাশে নেই কোনো গ্রাম, নেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস বা কোনো স্থাপনা। ফলে এ সড়কটি সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে আসবে না বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।
বান্দরবান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরের আওতায় ৪ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে যৌথ খামার থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ৩ কিলোমিটার ২৭০ মিটার এ সড়ক উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৭ কোটি ৯৮ লাখ ৩২ হাজার ২৩৭ টাকা। হিমু কনস্ট্রাকশন নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন আওয়ামী লীগ নেতা মিলন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, টেন্ডারে জনবসতিবহুল সড়কের নাম ব্যবহার করলেও, কোটি কোটি টাকার কাজ করছে অন্য এলাকায়। যেখানে নেই কোনো গ্রাম, নেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নেই সরকারি-বেসরকারি কোনো স্থাপনা। এই সড়ক নির্মাণ বরং উপকার করছে এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার মালিকানাধীন রিসোর্ট ও বাগানগুলোতে যাতায়াতে। এ ধরনের কাজ সরকারি অর্থের অপচয় এবং উন্নয়নের নামে অতিরিক্ত সুফল বেসরকারি কিছু ব্যক্তির সুযোগ তৈরি করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ঠিকাদার বলেন, প্রকল্পের চুক্তিপত্রে যৌথ খামার থেকে টাইগার পাড়া সড়ক পর্যন্ত উন্নয়নের কথা থাকলেও কাজ করছে অন্যত্র, যা টেন্ডারের শর্ত পরিপন্থী বলে জানান।
টাইগার পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা কালাচাং তঞ্চঙ্গ্যা ও সোহেল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, নীলাচল সড়কে যৌথ খামার থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিদিন স্থানীয় মানুষসহ হাজার হাজার পর্যটক এই ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে চলাচল করেন। দুই জায়গায় ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত হয়েছে তবু নেই সংস্কার।
তাঁরা আরও বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল সড়ক বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকলেও, এ সড়কের বরাদ্দের টাকায় কাজ করছে জনবসতিহীন এলাকায়। এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অগ্রহণযোগ্য।
সুমন তঞ্চঙ্গ্যা নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, টাইগার পাড়া থেকে রুপালী ঝরনা পর্যন্ত পুরো সড়কজুড়ে নেই কোনো গ্রাম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সরকারি স্থাপনা।
তিনি আরও বলেন, রুপালী ঝরনায় যেতে সাধারণ মানুষ কখনোই এই সড়ক ব্যবহার করে না। রেইচা বাজারের প্রধান সড়ক থেকে মাত্র এক কিলোমিটার পথ পার হলেই ঝরনায় যাওয়া যায়। তাই টাইগার পাড়া হয়ে রুপালী ঝরনায় যাতায়াতের প্রয়োজনই পড়ে না। এ পথ স্থানীয়দের কোনো কাজে আসে না বলে জানান।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, টাইগার পাড়া থেকে রুপালী ঝরনা বা সিনিয়র পাড়া পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। কোথাও পাহাড় কেটে সমান করা হচ্ছে, আবার কোথাও সাইট ওয়ালের পাশের পাহাড় কেটে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। পুরো সড়কজুড়ে কমবেশি পাহাড় কাটার স্পষ্ট চিত্র দেখা যায়।
পাহাড় কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবান জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রেজাউল করিম বলেন, সড়ক নির্মাণে পাহাড় কাটার অভিযোগ আমরা পেয়েছি। আমি বান্দরবানে দেড় বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছি। এই সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান পাহাড় কাটার জন্য অনুমতি নেয়নি। এর আগে অনুমতি নেওয়া হয়েছে কিনা তা সরেজমিনে গিয়ে যাচাই করতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় সড়ক উন্নয়নে কিছু পাহাড় কাটতে হয়, তবে এর জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে লিখিত অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন পড়ে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বান্দরবান জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাসাউর বলেন, পার্বত্য জেলাগুলোর সিস্টেম হলো আগে রাস্তা নির্মাণ করা হয়, পরে ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে ওঠে। বর্তমানে যে সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে, তা টাইগার পাড়া হয়ে রুপালি ঝরনা হয়ে রেইচা মেইন সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। রাস্তাটি হলে রেইচা দিক দিয়েও যাতায়াত করা যাবে, আবার টাইগার পাড়ার দিক দিয়েও যাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, সড়কের পাশে কারো ব্যক্তিগত রিসোর্ট বা কোনো নেতার বাগান রয়েছে কিনা, তা আমার দেখার বিষয় নয়। এ সড়কটি ২০১৩ সালেই এলজিইডির গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে এটা ভুল হয়েছে, রাস্তার নাম 'যৌথ খামার-টাইগার পাড়া' হওয়া উচিত ছিল না। রাস্তার নাম হওয়া উচিত ছিল 'টাইগার পাড়া-রুপালি ঝরনা-রেইচা মেইন সড়ক'। এই দুই সড়কে দুইটি আইডি রয়েছে, আইডি অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।











