দুই বছর পর পেকুয়ার নিস্তব্ধ কবরস্থান: কান্নায় ভেজা ১৬ জুলাই আর বিচারের অনন্ত অপেক্ষা
বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:২৪ পূর্বাহ্ন

দুই বছর পর পেকুয়ার নিস্তব্ধ কবরস্থান: কান্নায় ভেজা ১৬ জুলাই আর বিচারের অনন্ত অপেক্ষা

দুই বছর পর পেকুয়ার নিস্তব্ধ কবরস্থান: কান্নায় ভেজা ১৬ জুলাই আর বিচারের অনন্ত অপেক্ষা
ছবি সংগৃহীত।

বিচারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অসমাপ্ত জীবনের হিসাব নিয়ে দিন কাটছে চট্টগ্রামের প্রথম তিন শহীদ পরিবারের; মেলেনি সান্ত্বনা, কাটেনি আঁধার

 আজ ১৬ জুলাই। ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের এই রক্তঝরা দিনেই অবরুদ্ধ বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাজপথে প্রথম অধিকারের দাবিতে রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল একঝাঁক তরুণ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনটিতে যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং তৎকালীন সরকারি বাহিনীর যৌথ বুলেট ও নির্মমতায় রক্তাক্ত হয়েছিল মুরাদপুর ও শুলকবহর এলাকা। মুহূর্তের ব্যবধানে ঝরে যায় তিনটি তাজা প্রাণ—চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী মো. ওয়াসিম আকরাম, ওমরগণি এমইএস কলেজের তরুণ প্রাণ ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং খেটে খাওয়া সাধারণ কর্মজীবী যুবক মো. ফারুক। একই দিনে উত্তরের জনপদ রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় বুক পেতে দেওয়া বীর আবু সাঈদের মহাকাব্যিক আত্মত্যাগ দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে যেভাবে এক অপ্রতিরোধ্য গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দিয়েছিল, ঠিক তেমনি চট্টগ্রামের এই তিন তরুণের রক্তে জ্বলন্ত ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল সমগ্র দক্ষিণ ও উপকূলীয় চট্টগ্রামজুড়ে।

রক্তাক্ত সেই ১৬ জুলাইয়ের পর আজ দুই বছর পেরিয়ে ২০২৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ এই সময়কালে নদীর জল বহু দূর গড়িয়েছে। স্বৈরাচারী শক্তির পতন হয়েছে, গঠিত হয়েছে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের অর্থ, বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র এবং বীরের সম্মানে রাষ্ট্রীয় নানা প্রোটোকল হয়তো মিলেছে, কিন্তু শহীদ পরিবারের চোখের ঘুম কাড়েনি। সেই ক্রন্দনাকুল বাড়িগুলোতে এখনো সময় যেন থমকে আছে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ের দুপুর ৩টার কাঁটায়। বেদনার কালো চাদর, বিচারের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রতীক্ষা আর বুকফাটা শূন্যতা সঙ্গী করে ধুঁকছে পরিবারগুলো। রাষ্ট্র বা রাজনীতি যা-ই বলুক না কেন, সন্তানহারা মা-বাবার কাছে আজও একটি জ্বলন্ত জিজ্ঞাসা—"আমার নিরাপরাধ ছেলেকে যারা গুলি করে মারল, তাদের চূড়ান্ত বিচার কবে হবে?"

পেকুয়ায় এক বাবার অন্তহীন রোদন ও পেছনের নির্মম সত্য

চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ছাত্র এবং কলেজ শাখা ছাত্রদলের তৎকালীন তেজস্বী যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ওয়াসিম আকরাম ছিলেন তার পরিবারের বড় সন্তান। তাকে ঘিরেই বোনা হয়েছিল পরিবারের শত স্বপ্ন ও আশার আলপনা। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই মুরাদপুরের রাজপথে যখন তিনি অধিকারের সপক্ষে শ্লোগান দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সাঁজোয়া যান ও সশস্ত্র যুবলীগ-ছাত্রলীগ ক্যাডারদের নির্বিচার গুলির মুখে বুক পেতে দেন ওয়াসিম।

ওয়াসিমের জন্মভিটা দক্ষিণ চট্টগ্রামের কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার এক শান্ত পল্লীতে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পেকুয়ায় গিয়ে শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করেন এবং তার মা জোসনা বেগমের হাতে ২০ লাখ টাকার রাষ্ট্রীয় সঞ্চয়পত্র তুলে দেন। আর্থিক স্বস্তি এসেছে ঠিকই, কিন্তু যে বাবা শফিউল আলম দীর্ঘ সময় ধরে সৌদি আরবের উত্তপ্ত মরূদ্যানে শ্রম দিয়েছেন সন্তানের সোনালি ভবিষ্যতের আশায়, তিনি আজ ভগ্নহৃদয়। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে দেশে ফেরার পর আর প্রবাসে পাড়ি জমাননি তিনি।

বুকের সমস্ত আকুতি ঢেলে শফিউল আলম বলেন:

“ঘটনার সময় আমি দূর প্রবাসে ছিলাম। খবর পেয়ে যখন দেশে ফিরি, আমার সাজানো বাগান তখন ছাই। ওর মা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছিলেন। মামলার গতিপ্রকৃতি বা আইনের কূটচাল আমি বুঝি না। শুধু একটাই মিনতি এই সরকারের কাছে—আমার ছেলেকে যারা প্রকাশ্যে গুলি করে বুক ঝাঁঝরা করেছে, সেই খুনিদের যেন ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়। বিচারের রায় দেখে মরতে পারলে কবরে গিয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারব।”

আইনি নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট ওয়াসিমের মা জোসনা বেগম বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে ঘটনার গভীরতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপকতা বিবেচনায় মামলাটির তদন্তভার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। চলতি বছরের ৫ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের শঙ্কা, আইনি দীর্ঘসূত্রতা যেন এই ঐতিহাসিক ট্রাইব্যুনালকে মন্থর না করে ফেলে।

নীরবতায় মোড়ানো শান্তর ঘর: মা কহিনুর আক্তারের শূন্য চোখের চাহনি

ওমরগণি এমইএস কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত ছিলেন মা-বাবার একমাত্র প্রদীপ, একমাত্র সন্তান। তার চলে যাওয়ার পর চট্টগ্রামের ভাড়া বাসায় যে হাহাকার নেমে এসেছে, তার তুলনা কোনো পার্থিব সম্পদের সাথে হতে পারে না। যে ঘরটি একসময় শান্তর বন্ধুবান্ধবদের আড্ডা, খুনসুটি আর প্রাণোচ্ছল হাসিতে মুখরিত থাকত, সেখানে এখন শ্মশানের নীরবতা।

শান্তর বাবা জাকির হোসেন ও মা কহিনুর আক্তার এখন বেঁচে আছেন কেবলই স্মৃতির মালা গেঁথে। কোনো উৎসবের আলো তাদের স্পর্শ করে না। ঈদের আনন্দ কিংবা সাধারণ কোনো বিকেল—সবখানেই শান্তর পছন্দের খাবারের পাতের পাশে শূন্যতা হা করে তাকিয়ে থাকে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এবং 'জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন' শান্তর পরিবারকে এককালীন আর্থিক অনুদান দিয়েছে। কিন্তু শান্তর মায়ের কাছে এই কাগজের নোটগুলো অর্থহীন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কহিনুর আক্তার বলেন:

“টাকা দিয়ে কি শান্তকে এনে দিতে পারবে কেউ? কোটি টাকা দিলেও তো আমার শান্ত আর মা বলে ডাকবে না। আমরা শুধু একটা জিনিসই চাই—যারা বুক ফুলিয়ে আমার শান্তর মতো মাসুম বাচ্চার ওপর অস্ত্র ধরেছিল, তাদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়। যদি আমাদের জীবদ্দশায় এই খুনিদের বিচার দেখে যেতে না পারি, তবে খোদার দরবারে গিয়ে আমরা কী জওয়াব দেব?”

ফার্নিচার কারিগর ফারুকের পরিবারের জীবন্ত সংগ্রাম: রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে এক ট্র্যাজেডি

শহীদ মো. ফারুকের গল্পটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন না, জানতেন না কোটা সংস্কার আন্দোলনের খুঁটিনাটি। তিনি ছিলেন একজন সৎ ও কঠোর পরিশ্রমী ফার্নিচার মিস্ত্রি। কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে এসে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনমজুরের মতো কাজ করতেন শুধু দুই সন্তান আর স্ত্রীর মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে শুলকবহর এলাকায় সহিংসতার মাঝখানে আটকা পড়েন ফারুক। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি তপ্ত বুলেট তার বুক ভেদ করে চলে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পূর্বেই নিভে যায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এই মানুষটির জীবনপ্রদীপ। ফারুকের আকস্মিক মৃত্যুতে তার পরিবারটি অথৈ সাগরে ভেসে যায়। যদিও পরবর্তী সময়ে সাহায্য মিলেছে, তবে অভিভাবকহীন এই পরিবারের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা।

পুনর্বিবেচনা: রক্তক্ষয়ী সেই দুপুরের আদ্যোপান্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান

তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১৬ জুলাই বিকেল ৩টায় ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এক শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সকাল থেকেই পুরো ষোলশহর এলাকা অবরুদ্ধ করে ফেলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। সংঘাত এড়াতে শিক্ষার্থীরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে পার্শ্ববর্তী মুরাদপুর মোড়ে জড়ো হতে শুরু করে।

দুপুর ২টার পর থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে মুরাদপুরে অবস্থান নেন। বিকেল ৩টার দিকে ষোলশহর থেকে লাঠিসোঁটা, রামদা, ককটেল ও আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত একটি বিরাট মিছিল মুরাদপুর মোড়ে এসে আন্দোলনরত নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত ও নৃশংস হামলা চালায়। হেলমেট পরিহিত চিহ্নিত ক্যাডাররা নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে শিক্ষার্থীদের দিকে ধেয়ে আসে।

গুলির মুখে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীরা প্রথমে কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও মুহূর্তের মধ্যে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত মুরাদপুর মোড়, বহদ্দারহাট ও জিইসি মোড় সংলগ্ন বিশাল এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ ও তৎকালীন সরকারের পেটোয়া বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও শটগানের ছররা গুলি ছুঁড়ে রাজপথ রক্তাক্ত করে। ৪টার দিকে পর পর গুলিবিদ্ধ হন ওয়াসিম, শান্ত ও ফারুক। চমেক হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাদের মৃত ঘোষণা করলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো চট্টগ্রাম।

আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তন ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের বক্তব্য

সেদিনের রক্তাক্ত আন্দোলনের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তার ভাষায়, ১৬ জুলাইয়ের ঘটনাই ছিল মূলত ফ্যাসিবাদের পতনের প্রথম পেরেক।

আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন:

“জুলাইয়ের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। আমরা কোনো অন্যায় দাবি নিয়ে রাজপথে নামিনি, নেমেছিলাম অধিকার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ১৬ জুলাই মুরাদপুরের সেই নৃশংসতা চট্টগ্রামের আন্দোলনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। ওয়াসিম ছিল আমার ছোট ভাইয়ের মতো, এক দুর্দান্ত সাহসী নেতৃত্ব। চমেক হাসপাতালের মর্গের সামনে যখন ওর নিথর দেহটা দেখলাম, তখন আমাদের শোক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। আমরা শপথ নিয়েছিলাম, এই রক্তের ঋণ বৃথা যেতে দেব না। আজ আমরা স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে নিঃশ্বাস নিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু খুনিদের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের বিপ্লব অসম্পূর্ণ।”

দুই বছর পরও বিচার প্রক্রিয়ার এই ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও আন্দোলনের সমন্বয়কেরা। তারা বলছেন, শুধুমাত্র কাগজে-কলমে মামলার অভিযোগপত্র জমা দেওয়াই শেষ কথা নয়, দ্রুততম সময়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের হত্যাকারী ও নির্দেশদাতাদের ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। তবেই শান্ত ও ওয়াসিমদের আত্মা শান্তি পাবে, শান্তি পাবে শোকার্ত বাংলাদেশ।




আগামী ৫ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আশা অ্যামচেমের

আগামী ৫ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আশা অ্যামচেমের
ছবি সংগৃহীত।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও এগিয়ে নিতে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)। সংগঠনটি জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে মার্কিন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে আরও ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আনতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে অ্যামচেমের নেতারা এই প্রত্যাশার কথা জানান। অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের নেতৃত্বে সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির একটি প্রতিনিধিদল এই বৈঠকে অংশ নেয়।

সাক্ষাৎকালে অ্যামচেম জানায়, ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং একটি স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে তারা কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে সংগঠনটির সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের কর রাজস্বে ২০ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে। বিগত বছরগুলোতে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে উল্লেখ করে প্রতিনিধিদল আরও বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে এবং এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারের অংশীদারত্ব কামনা করে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের অগ্রগতির প্রশংসা করে অ্যামচেম। বিশেষ করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সংস্কার প্যাকেজের আওতায় নির্ধারিত সময়ে অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদান, সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা চালু, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের ডিজিটাইজেশন, কমপ্লায়েন্সের চাপ কমানো, মূলধন ও মুনাফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণের মতো বাস্তবমুখী পদক্ষেপগুলোকে তারা স্বাগত জানায়।

পাশাপাশি অগ্রাধিকার খাতগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির স্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের ক্ষেত্রে পিডিপিএ ও এনডিজিএ প্রণয়নের পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়ন, এআই ও সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির কাঠামোকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে অ্যামচেম প্রযুক্তি, এআই, ক্লাউড প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আর্থিক খাতের আধুনিকায়নের মতো ক্ষেত্রগুলো নিয়ে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে এবং সংস্কার বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য অ্যামচেমের পক্ষ থেকে 'ডিজিটাল ইকোনমি অ্যাডভাইজরি ফোরাম' বা টাস্কফোর্স এবং 'পাবলিক-প্রাইভেট কম্পিটিটিভনেস কাউন্সিল' গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এছাড়া ৩০তম ইউএস ট্রেড শো-র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

অ্যামচেমের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রমের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। নীতির স্পষ্টতা, দক্ষ প্রশাসন এবং ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও জোরদার করা হবে বলে উল্লেখ করে তিনি সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দেন এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সহযোগিতা এগিয়ে নিতে অ্যামচেমের সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও গভীর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে সরকারের পক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে অ্যামচেম প্রতিনিধিদলে সহসভাপতি আলা উদ্দিন আহমদ, কোষাধ্যক্ষ রেজা উর রহমান মাহমুদ, নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া, মোহাম্মদ রাসেল আল মামুন, মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন, আতাউর রহিম চৌধুরী এবং নির্বাহী পরিচালক চৌধুরী কায়সার মোহাম্মদ রিয়াদ অংশ নেন।




চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মুন্না, সদস্যসচিব জোবাইরুল

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মুন্না, সদস্যসচিব জোবাইরুল
ছবি সংগৃহীত।

বাংলাদেশ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়েছে। নবগঠিত কমিটিতে লায়ন এ এম মুন্না চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও জোবাইরুল আলম মানিককে সদস্যসচিব করা হয়েছে।

সোমবার (১০ আগস্ট) জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার শামসুল আলম; যুগ্ম আহ্বায়ক প্রকৌশলী মোঃ আরিফুল ইসলাম, জয়নুল আবেদীন কায়সার, মোহাম্মদ সেলিম, আলাউদ্দিন মাসুদ, প্রকৌশলী মোহাম্মদ কাইয়ুম; সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব মোঃ মুশফিকুর রহমান চৌধুরী; যুগ্ম সদস্যসচিব যথাক্রমে মাওলানা আনাস মাহমুদ, আরিফুর রহমান, ফরিদুল আলম, মীর মনসুরুল ইসলাম, জহির উদ্দিন, রোকজিনা আক্তার, জিয়াউল করিম, মোহাম্মদ আরজু, মোহাম্মদ ফারুক হোসেন, মোঃ নুরুল আমীন, মঈনুদ্দিন সাকিব; সাংগঠনিক সম্পাদক যথাক্রমে মোঃ সাজ্জাদ হোসেন, সিফাত চৌধুরী; দপ্তর সম্পাদক ইরফান মাহমুদ আল সাঈদ; আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আরমান উদ্দিন আজাদ; প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইমরান হোসেন তারা; জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক শাহেদুল আলম; কোষাধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম; সমাজকল্যাণ সম্পাদক শেখ বদিউল আলম নোমান; তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মোঃ শাহরিয়ার ইমন; শিক্ষা‌বিষয়ক সম্পাদক মোসলেম উদ্দিন শাকিল এবং নারীবিষয়ক সম্পাদক পদে ডালিয়া বড়ুয়া দায়িত্ব পেয়েছেন।

নবগঠিত কমিটির সদস্যসচিব জোবাইরুল আলম মানিক বলেন, "সংগঠনের গতিশীলতা বৃদ্ধি ও দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এ কমিটি রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। আগামীতে প্রতিটি স্থানীয় নির্বাচনে আমাদের সদস্যরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখবেন।"




বাঁশখালীতে ছেলের হাতে বাবা খুন!

বাঁশখালীতে ছেলের হাতে বাবা খুন!
নিহত বাবা শাহজাহান ও তাঁর হত্যাকারী ছেলে মুহাম্মদ শওকত।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পারিবারিক কলহের জেরে ঘাতক ছেলের হাতে মোহাম্মদ শাহজাহান নামে এক বাবা খুন হয়েছেন। সোমবার রাতে উপজেলার কালীপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম কোকদণ্ডী নিদাগাজী পাড়া এলাকায় সংঘটিত এই ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হতভাগ্য বাবা প্রাণ হারিয়েছেন।

পারিবারিক কলহের জেরে সোমবার রাতে প্রবাসফেরত ঘাতক ছেলে মুহাম্মদ শওকত (২২) বাবার ওপর হামলা চালায়। এতে বাবা শাহজাহান মারাত্মকভাবে আহত হলে আত্মীয়স্বজনরা তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে শাহজাহান মারা যান। ছেলের হাতে বাবার মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

জানা গেছে, ছেলে মুহাম্মদ শওকত প্রবাসে ছিলেন। সেখান থেকে পাঠোনো টাকায় বাড়িতে পাকা দালান তোলার কাজ শুরু হয়। পরে ছেলে অনলাইনে পরিচয়ের সূত্রে মা-বাবার অজান্তে এক মেয়েকে বিয়ে করেন। ওই মেয়েকে নিয়ে শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। এর মধ্যে বন্যা শুরু হলে স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িতে চলে আসেন ছেলে। এ নিয়ে পিতা-পুত্রের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া ও বিবাদ হতো।

সোমবার রাতে বাবা ছেলেকে বিদেশ থেকে চলে আসার বিষয় নিয়ে বকাঝকা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ছেলে শওকত বাবার ওপর হামলা চালান। এলোপাতাড়ি মারধরে অজ্ঞান হয়ে যান বাবা শাহজাহান। স্বজনেরা তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলেও তাঁর আর জ্ঞান ফেরেনি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে বাবা শাহজাহান প্রাণ হারান।

বাঁশখালী থানার ওসি রবিউল হক জানান, প্রাথমিকভাবে পারিবারিক কলহের জেরে এই খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘাতক ছেলেকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।