ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদ: নথি জালিয়াতির মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার মিশন আওয়ামী লীগ নেতার

নথি জালিয়াতির মাধ্যমে কক্সবাজার সদরের ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের ‘প্যানেল চেয়ারম্যান’ পদ দখলে নিতে মরিয়া আওয়ামী লীগ নেতা শাহাবুদ্দিন। ইতোমধ্যে তিনি বিভিন্ন দপ্তরে দফায় দফায় আবেদনও করেছেন। এ নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত শাহাবুদ্দিন বহিষ্কৃত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা কামাল উদ্দিনের চাচাতো ভাই।
১৫ এপ্রিল সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর আবেদন করেন আওয়ামী লীগ নেতা শাহাবুদ্দিন। একই আবেদন ২৪ আগস্ট জেলা প্রশাসকের নিকট করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, কামাল উদ্দিন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার প্রথম সভায় তাকে প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
তবে দুই দিন পর, ২৩ সেপ্টেম্বর আবারও ডিসি বরাবর আবেদনে লিখেন, ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর তাকে প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনের পর শপথ গ্রহণ পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাসে। আগের তিন আবেদনে প্রথম সভায় প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করার দাবি করলেও মূলত তার আবেদনে উল্লেখিত তারিখটি প্রায় ৯ মাস পরের।
এদিকে সর্বশেষ আবেদন অনুযায়ী রিট করেন হাইকোর্টে। যেখানে ডিসি ও ইউএনও বরাবর আবেদন করা সব আবেদনপত্র যুক্ত করে দেন। হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। রিট পিটিশন নম্বর ১৬১৮৪/২০২৫। চলতি বছরের ২৮ অক্টোবরের রিটের শুনানিতে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও মোঃ আশিফ হাসানের আদালত রায় দেন যে, ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের বহিষ্কৃত ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা কামাল উদ্দিনের চাচাতো ভাই হওয়ায় ক্ষমতা হারানোর পরও শাহাবুদ্দিনকে চেয়ারে বসাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। যার ফলে ইউনিয়ন পরিষদের সভার বহিতে খাঁকা রাখা পৃষ্ঠায় মেম্বারদের স্বাক্ষর নিয়ে তাকে প্যানেল চেয়ারম্যান বানিয়েছেন বলে দাবি করেন।
কিন্তু আমাদের হাতে আসা কয়েকটি নথি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের অধিকাংশ মেম্বারগণ ২০২২ সালের ৮ মে ইউনিয়ন পরিষদে প্যানেল চেয়ারম্যান না থাকায় তৎকালীন ডিসি বরাবর প্যানেল চেয়ারম্যান দিতে আবেদন করেন। সেখানে তারা উল্লেখ করেন, প্রথম সভা হয় ৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২২ইং তারিখে। সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রথম সভার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্যানেল চেয়ারম্যান করার নিয়ম থাকলেও তিনি করেন নি এবং তারা আরো উল্লেখ করেন চেয়ারম্যান কামাল সবার অগোচরে পছন্দের ব্যক্তিকে প্যানেল বানাতে চেষ্টা করছেন। এদিকে চেয়ারম্যান পদে বসতে মরিয়া শাহাবুদ্দিন হাইকোর্টে করা রিট আবেদনে ২৩ অক্টোবর প্রথম সভায় প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার দাবি করলেও মেম্বারদের আবেদন অনুযায়ী জানা যায় প্রথম সভা হয়েছে মূলত ৭ই ফেব্রুয়ারি।
এদিকে কক্সবাজার সদর উপজেলার তৎকালীন ইউএনও মোহাম্মদ জাকারিয়া নানা অনিয়মের অভিযোগে ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদ পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি মেম্বারদের স্বাক্ষরযুক্ত কিন্তু বর্ণনা ও তারিখবিহীন বেশ কিছু সভার কার্যবিবরণী খাতা জব্দ করেন। যা তিনি স্মারক ১১১০/২০২২ মূলে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি মেম্বার বলেন, শাহাবুদ্দিনকে চেয়ারম্যান বানানোর মিশন মূলত আওয়ামী লীগের। কারণ আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি কমল ইতিমধ্যে মেম্বারদের ফোনে অনুরোধ করেছেন শাহাবুদ্দিনকে প্যানেল বানাতে।
এদিকে, ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ৩৩ ধারার ৫ উপধারা অনুযায়ী সদস্যদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যানের প্যানেল গঠন করা সম্ভব না হয়, তাহলে সরকার প্রয়োজনে সদস্যদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যানের প্যানেল তৈরি করতে পারবে। এবং এই ধারা অনুযায়ী বর্তমান এমইউপি মোঃ ফজলুল হককে প্যানেল চেয়ারম্যান বানাতে চলতি বছরের ১০ আগস্ট ১০ জন মেম্বারের স্বাক্ষর দিয়ে ডিসি বরাবর আবেদন করেন। সেই ১০ মেম্বারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ফজলুল হক মেম্বারকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদানের নিমিত্তে ইউএনওকে সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দিতে অনুরোধ করেন জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের সহকারী কমিশনার ইরফান উল হাসান চিঠি দেন। চিঠির প্রেক্ষিতে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গত ১৭ সেপ্টেম্বর ডিসি বরাবর মতামতসহ প্রতিবেদন দেন। যেখানে তিনি ভারুয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এমইউপি ফজলুল হককে প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে দেওয়া যেতে পারে মর্মে মতামত দেন। এরপর থেকেই দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন শাহাবুদ্দিন।










