৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম জ্বালানি পাইপলাইন: উদ্বোধনের এক মাসেই সরবরাহ বন্ধ, ফিরতে পারে নভেম্বরে

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সহজে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য প্রায় তিন হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাইপলাইনটি উদ্বোধনের মাত্র এক মাসের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। হিসাবে গরমিল, তেল সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সরবরাহ বন্ধ করা হলেও কর্তৃপক্ষ আশা করছে, চলতি নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহেই এটি পুনরায় চালু হতে পারে।
গত ১৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হলেও, চালুর পর পরই বিতর্কের মুখে পড়ে প্রকল্পটি। বাধ্য হয়ে বর্তমানে আবারও নৌপথে বেশি খরচে জ্বালানি পরিবহন করতে হচ্ছে।
যেভাবে ত্রুটি ধরা পড়ে:
পাইপলাইনটি চালুর পর চট্টগ্রাম থেকে দুই কোটি ৫৩ লাখ আট হাজার ৬৩ লিটার ডিজেল কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে পাঠানো হয়। তবে এই প্রক্রিয়ায় তিন লাখ ৭৫ হাজার ৩৬৮ লিটার তেলের হিসাবে গরমিল দেখা যায়।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ দুই লাখ ৬২ হাজার ৮০৪ লিটার ডিজেল পাইপলাইনে 'প্যাকিং হিসেবে' রয়ে গেছে বলে দায় স্বীকার করেছে।
তবে অবশিষ্ট এক লাখ ১২ হাজার ৫৬৪ লিটার ডিজেলের হিসাব এখনও মেলাতে পারেনি যমুনা অয়েল কোম্পানি।
তেল গায়েব বা ঘাটতির রহস্য উদঘাটনে এ পর্যন্ত চারটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
৪টি তদন্ত কমিটির কার্যক্রম:
১. যমুনা অয়েলের জিএম (ফাইন্যান্স) মোহাম্মদ জোবায়ের চৌধুরী-কে আহ্বায়ক করে অভ্যন্তরীণ কমিটি: এই কমিটি প্রায় ২৫ দিন পর প্রতিবেদন জমা দিয়ে জানায়, সাত হাজার ৭৭২ লিটার ঘাটতি ছিল। মূলত প্রথম ক্যালিব্রেশনে ভুল ছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। ২. যমুনা অয়েলের ডিজিএম (ইঅ্যান্ডডি) মো. আলমগীর আলমকে প্রধান করে গঠিত কমিটি: এই কমিটি ফতুল্লা ডিপোর ২২ ও ২৩ নম্বর ট্যাংকের 'রি-ক্যালিব্রেশন' করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রনি আহমেদ বলেন, "প্রথম ক্যালিব্রেশনের কিছু বিচ্যুতি আমরা পেয়েছি। প্রতিবেদনে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছি।" ৩. বিপিসির মহাব্যবস্থাপককে (বণ্টন ও বিপণন) আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটি: এই কমিটি গত ২ অক্টোবর গঠিত হলেও এখনও প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। ৪. জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল মান্নানকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটি: গত ৬ অক্টোবর গঠিত এই কমিটিতে বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের একজন অধ্যাপকও রয়েছেন। কমিটির আহ্বায়ক মো. আবদুল মান্নান জানান, তারা বিষয়টি বিশদ আলোচনা করেছেন, তবে প্রতিবেদন এখনও জমা পড়েনি।
বিপিসির বক্তব্য: চুরির আশঙ্কা নেই, প্রযুক্তিগত ত্রুটি:
বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স ও পরিকল্পনা) ও সরকারের যুগ্ম সচিব ড. এ কে এম আজাদুর রহমান তেলের ঘাটতিকে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, "বড় পাইপলাইন টিউনিং করতে হয়। স্ক্যাডা সিস্টেম (SCADA System) এবং ফ্লোমিটার আছে। ফলে পরিমাণের দিক থেকে কিছুটা তারতম্য হচ্ছে, অর্থাৎ রিডিংয়ের দিক থেকে। তেল হারিয়ে যাওয়ার কিছু নেই, যদি না চুরি করে।" তিনি আরও জানান, গরমের কারণে বা স্টোরেজ ট্যাঙ্কের ক্যালিব্রেশন ঠিকমতো না হওয়ার কারণেও ঘাটতি মনে হতে পারে।
ড. আজাদুর রহমানের আশা, "স্ক্যাডার সিস্টেম যারা দেখেন, ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের থেকে সময় নিয়েছেন... হয়তো নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে পাইপলাইন চালু হয়ে যাবে।" তিনি জানান, বিপিসি নভেম্বরের শেষের দিকে পুরো পাইপলাইনটি বুঝে নেওয়ার হস্তান্তর কাজ শুরু করেছে।
প্রকল্পের পটভূমি ও সাশ্রয়:
বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে ঢাকায় তেল পরিবহন করা হয়, যা খরচ ও সময়সাপেক্ষ। এই পাইপলাইন প্রকল্পটি চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো হয়ে ফতুল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত।
প্রাথমিক ব্যয়: শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা, যা বেড়ে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সাশ্রয়: বিপিসির তথ্যমতে, পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে ২৭ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে, যাতে প্রতিবছর প্রায় ২৩৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, আগামী ১৬ বছরের মধ্যে বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসবে।












