ফুটবল কেনার টাকায় হাঁস চুরি, তিন কিশোরের হাতে ফুটবল তুলে দিলেন ইউএনও

বয়স মাত্র ১২-১৩ বছর। চোখে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। পাড়ার মাঠে অন্যদের ফুটবল খেলতে দেখে তাদেরও ইচ্ছে হতো মাঠে নেমে বল নিয়ে ছুটতে। কিন্তু দরিদ্র দিনমজুর পরিবারের সন্তান হওয়ায় নিজেদের একটি ফুটবল কেনার সামর্থ্য ছিল না।
শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে ভুল পথে পা বাড়ায় কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর ধূরুং ইউনিয়নের তেলিয়াকাটা এলাকার তিন কিশোর—মৎস্যশ্রমিক মামুনের ছেলে মনির উদ্দিন শাহনেক (১৩), মৎস্যশ্রমিক মিজানের ছেলে মিনহাজ (১২) এবং দিনমজুর খোরশেদ আলমের ছেলে মুজাহিদ (১১)।
ফুটবল কেনার টাকা জোগাড় করতে তারা পাশের বাড়ির হাঁস চুরি করে। পরে সেই হাঁস বিক্রি করতে নিয়ে আসে ধূরুং বাজারে। তবে হাঁস বিক্রির আগেই বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তিন কিশোরের বিষয়টি নজরে আসে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আবুল কাশেমের।
তিনি তাৎক্ষণিক বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমানকে জানান।
সাধারণত এমন ঘটনায় শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় শিশু-কিশোরদের। তবে কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বিষয়টিকে দেখলেন ভিন্নভাবে।
তিন কিশোরের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, হাঁস চুরির পেছনে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ফুটবল কেনার টাকা জোগাড় করা। তাদের অভিভাবকেরা দিনমজুর। অভাবের সংসারে সন্তানদের খেলাধুলার সামগ্রী কিনে দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই।
তিন কিশোরের ভুলের জন্য তাদের বুঝিয়ে সতর্ক করেন ইউএনও। তিনি বলেন, অন্যের জিনিস নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়। স্বপ্ন পূরণ করতে হলে সঠিক পথেই এগোতে হবে।
এরপরই আসে মানবিকতার মুহূর্ত। যে ফুটবল কেনার জন্য তিন কিশোর ভুল করেছিল, বুধবার বিকেলে অফিসার্স ক্লাবে সেই ফুটবলই তাদের হাতে তুলে দেন ইউএনও মো. মিজানুর রহমান।
এ সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অসীম কুমার দাস, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইকবাল হাসান, উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মুসলিম উদ্দিন, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আবুল কাশেম, ক্রীড়া সংগঠক এহাছান মোহাম্মদ ছেটন ও মোহাম্মদ মুবিন উপস্থিত ছিলেন।
নতুন ফুটবল হাতে পেয়ে যেন বদলে যায় তিন কিশোরের মুখ। অপরাধবোধের জায়গায় ফুটে ওঠে আনন্দের হাসি। তাদের চোখে তখন আর হাঁস বিক্রির চিন্তা নেই, আছে মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলার স্বপ্ন। এখন থেকে নিয়মিত মাঠে ফুটবল খেলবে তারা।
উত্তর ধূরুং ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান ইমরুল ফারুক বলেন, ১২-১৩ বছরের কিশোরদের ভুলকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের পারিবারিক বাস্তবতা, স্বপ্ন ও বেড়ে ওঠার পরিবেশও বিবেচনায় নিতে হবে। শাসনের পাশাপাশি প্রয়োজন ভালোবাসা, শিক্ষা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ জানান।
উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আবুল কাশেম বলেন, শাহনেক, মিনহাজ ও মুজাহিদের গল্পটি কেবল হাঁস চুরি কিংবা একটি ফুটবল পাওয়ার গল্প নয়; এটি অভাবের মধ্যেও স্বপ্ন দেখা তিন কিশোরের গল্প। আর সেই স্বপ্নকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে সঠিক পথে এগিয়ে দেওয়ার এক মানবিক উদ্যোগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান।
হয়তো কোনো একদিন তেলিয়াকাটার মাঠে এই তিন কিশোরের পায়ে ফুটবল ছুটবে। গোলের পর তারা যখন উচ্ছ্বাসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরবে, তখন তাদের মনে পড়বে সেই দিনের কথা—ফুটবলের জন্য যখন তারা ভুল করেছিল, তখন শাস্তির পাশাপাশি একজন মানুষ তাদের স্বপ্নটাকেও বুঝেছিলেন। সেই মানুষটি কুতুবদিয়ার ইউএনও মো. মিজানুর রহমান।












