রুমার দুর্গম পাহাড়ে যাতায়াতের দুর্ভোগ লাঘবে সেনাবাহিনীর ‘সম্প্রীতি এক্সপ্রেস’

১৪ পাড়ার মানুষের জন্য চাঁদের গাড়ি প্রদান, সহজ হবে রোগী ও কৃষিপণ্য পরিবহন।
বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত দুর্ভোগ লাঘব এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রুমা জোন। দুর্গম এলাকার ১৪টি পাড়ার মানুষের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন ও জরুরি রোগী স্থানান্তরের সুবিধার্থে ‘সম্প্রীতি এক্সপ্রেস’ নামে একটি চাঁদের গাড়ি প্রদান করেছে সেনাবাহিনী।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে মুননুয়াম পাড়া আর্মি ক্যাম্পে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় পাড়ার প্রতিনিধিদের হাতে গাড়িটির চাবি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রুমা জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী হাসান সরকার, এসবিপি, পিএসসি (অধিনায়ক, ৩৬ বীর)।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে মুননুয়াম পাড়া, আরথাহ পাড়া, বাসাত্লং পাড়া ও হ্যাপিহিল পাড়াসহ আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দারা যোগাযোগব্যবস্থার সংকটে ভুগছিলেন। এসব এলাকায় বসবাসরত বম জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ ছিল বেশ কষ্টসাধ্য।
বিশেষ করে রুমা থেকে মুননুয়াম পাড়া রুটে নিয়মিত কোনো যানবাহন চলাচল না করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে যাতায়াত ও কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে হতো। অসুস্থ রোগীদের জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও পড়তে হতো চরম ভোগান্তিতে। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছিলেন পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দারা।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মুননুয়াম পাড়া পরিদর্শনকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের যোগাযোগসংক্রান্ত সমস্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন এবং সমাধানের আশ্বাস দেন। এরই ধারাবাহিকতায় রুমা জোনের উদ্যোগে স্থানীয় জনগণের জন্য ‘সম্প্রীতি এক্সপ্রেস’ নামে চাঁদের গাড়িটি প্রদান করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গাড়িটি প্রাথমিকভাবে মুননুয়াম পাড়া, আরথাহ পাড়া, হ্যাপিহিল পাড়া ও বাসাত্লং পাড়ার বাসিন্দাদের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হবে। পাশাপাশি আশপাশের আরও ১০টি পাড়ার বাসিন্দারাও প্রয়োজন অনুযায়ী এ পরিবহনসেবা গ্রহণ করতে পারবেন। ফলে মোট ১৪টি পাড়ার মানুষ এ উদ্যোগের সুফল পাবেন।
গাড়িটি চালু হলে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে অসুস্থ রোগীদের দ্রুত রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে ব্যয় ও সময় কমার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে, গাড়িটির সুষ্ঠু পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় পাড়ার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির মাধ্যমে গাড়িটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম তদারকি করা হবে। এর ফলে ১৪টি পাড়ার মানুষ দীর্ঘমেয়াদে এ পরিবহনসেবার সুফল পাবেন বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
স্থানীয় পাড়াবাসীরা জানান, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিনের যাতায়াত সংকট নিরসনে সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগ তাঁদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে গাড়িটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। এ জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের জন্য তাঁরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রুমা জোনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে থাকা পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবনযাত্রায় ‘সম্প্রীতি এক্সপ্রেস’ কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, তা এখন সময়ই বলে দেবে। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এ উদ্যোগ দুর্গম পাহাড়ের মানুষের যাতায়াত সংকট নিরসনের পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।











